মোহাম্মদ সোহেল, নোয়াখালী :
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাটে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির (২৮) অপরাজনীতির বলি হয়েছেন বলে দাবি করেছেন নোয়াখালীর গণমাধ্যম কর্মীরা।

এদিকে পুত্র শোকে মাতম মা মমতাজ বেগম ছেলে মুজ্জাকিরকে যে-বা যারা হত্যা করেছে, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তিনি তাঁর ছেলের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যু দন্ড দাবি করে বলেন, আমার ছেলে হিয়ানে গেছে আর গুলি খাইছে, গুলি। অ্যাঁই আছিলাম অ্যাঁর বাপের বাড়িত। অ্যাঁই কিছু তো কঁইতাম হাইতাম ন। তারা অ্যাঁর ছেলেরে (সংঘর্সকারীরা) গুলি করে মারি হালাইছে। অ্যাঁর বাবা আর ফিরে আইসতো ন। অ্যাঁর ছেলেরে শেষ করে দিছে। অ্যাঁর ছোট ছেলে মুজ্জাকির, তার হত্যার বিচার চাই।

রোববার বেলা ১২টার দিকে জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর ফকিরা গ্রামের বাদশা মিয়া মেস্ত্রী বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে নিহত সাংবাদিক মুজ্জাকিরের মা মমতাজ বেগম পুত্র শোকে আহাজারি করছেন। সেখানে রয়েছেন মুজ্জাকিরের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু মহল। রয়েছে শুধু মুজ্জাকিরের শূন্যতা। বার বার ঘরের মেঝেঁতে লুটিয়ে পড়ছেন মা মমতাজ বেগম। আত্মচিৎকার করে কান্না করছেন বোন ফেরদাইস, নুর নাহার, গুল জাহান, গুল নাহার ও আত্মীয় স্বজনরা।

স্থানীয় মোজ্জামেল হক ঘটনার বিবরণে বললেন, সেদিন (শুক্রবার) সন্ধ্যার আগ মুহুর্তে কাদের মির্জার সমর্থকদের সঙ্গে উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ওই সময় ছবি তুলছিলো সাংবাদিক মুজ্জাকির। এসময় হঠাৎ করে আমাকে বাঁচান বলে মাটিতে পড়ে যায় মুজ্জাকির। পরে আমিসহ (মোজ্জামেল হক) আরো লোকজন এসে তাঁকে হাসপাতাল পাঠায়।

মুজ্জাকিরের বন্ধু রিয়াজ হোসেন বলেন, আমাদের বন্ধু মহলের মধ্যে সবছে ভালো এবং মেধাবী ছিলো মুজ্জাকির। সে কখনো কারও সাথে বেয়াদবি করেনি। সব সময় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত ছিল। মন্ধু মহলের পক্ষ থেকেও মুজ্জাকির হত্যার বিচার দাবি করা হয়েছে।

মুজ্জাকিরের ভগ্নিপতি আবদুস ছাত্তার ও শেখ মশিউর রহমান বলেন, আমরা কোন রাজনীতি বুঝিনা। আমরা বুঝি আজকে অপরাজনীতির বলি হয়েছেন দেশের একজন বিবেক সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজ্জাকির। আমরা আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে মুজ্জাকিরের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করছি। এই ঘটনায় মামলার বিষয়ে তারা বলেন, মুজ্জাকিরের লাশ ঢাকা থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে আনা হচ্ছে। রাত ৮টায় জানাযার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তারঁ লাশ দাপন করা হবে। মুজ্জাকিরের দাপন সম্পন্ন হলেই মামলা করা হবে।

স্থানীয়রা জানান, মুজ্জাকির কাদের গুলিতে গুলিবৃদ্ধ হয়েছেন, তা ঘটনাস্থলের দোকানগুলোতে লাগানো সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পর্যবেক্ষণ করলেই বেরিয়ে আসবে।
এদিকে দুপুরে নোয়াখালী প্রেসক্লাবের সামনের সড়কে সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজ্জাকির হত্যার প্রতিবাদে এবং হত্যাকারীদের চিহিৃত করে আইনের আওয়তায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিতে নোয়াখালী প্রেসক্লাবের ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাই আবদুল কাদের মির্জার তথাকথিত ‘সত্যবচনে’ অশান্ত হয়ে ওঠা কোম্পানীগঞ্জে বিবদমান দুই পক্ষের অপরাজনীতির নির্মম বলি হয়েছেন তরুণ সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির। ওই ঘটনার সঙ্গে যে বা যাঁরাই জড়িত থাকুক না কেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাঁদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তাঁরা। একই সময়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় জেলার চাটখিল ও কোম্পানীগঞ্জে।

অন্যদিকে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ.এইচ.এম খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজ্জাকির হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি এই ঘটনায় জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহেদুল হক বলেন, সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজ্জাকির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো (রোববার দুপুর পর্যন্ত) থানায় মামলা হয়নি। পরিবারের অভিযোগের আলোকে এ বিষয়ে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এছাড়া কাদের গুলিতে বুরহান গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, সেটি বের করতে পুলিশ ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন ওসি।

উল্লেখ্য : সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে কাদের মির্জার অব্যাহত মিথ্যাচারের প্রতিবাদে গত শুক্রবার বিকেলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চাপরাশিরহাট বাজারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল। মিছিলটি বিকেল পাঁচটায় বাজারসংলগ্ন তার বাড়ি থেকে বের হয়ে চাপরাশিরহাট মধ্যম বাজারে গেলে কাদের মির্জার অনুসারীরা মিছিলে হামলা চালান। এ সময় সেখানে উপস্থিত পুলিশ দুই পক্ষকে দুই দিকে ধাওয়া করে এবং ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর কাদের মির্জার নেতৃত্বে তার শতাধিক অনুসারী মোটরসাইকেল ও গাড়িযোগে চাপরাশিরহাট এলাকায় যান। একপর্যায়ে কাদের মির্জার সমর্থকেরা বাজারসংলগ্ন মিজানুর রহমানের বাড়িতে হামলা ও গুলি চালান। এসময় কর্তব্য পালনকালে সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হন। গুলিতে তাঁর মুখের নিচের অংশ এবং গলা ঝাঁজরা হয়ে যায়। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন কমপক্ষে ছয়জন। ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন বুরহানসহ আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে প্রথমে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখান থেকে সন্ধ্যায় নেওয়া হয় নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে। এরপর রাতেই বুরহানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাংবাদিক বুরহানের মৃত্যু হয়।

বুরহান উদ্দিন মুজ্জাকির দৈনিক বাংলাদেশ সমাচার ও বার্তা বাজার ডটকম এর নোয়াখালী প্রতিনিধি ছিলেন।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/রা

Sharing is caring!