নিজস্ব প্রতিবেদক :

গত বছরের শেষদিকে চীনের উহান প্রদেশ থেকে বিশে^ ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। এ ভাইরাসের প্রভাবে চলতি বছরের শুরু থেকেই বিশ্ব অর্থনীতি ছিল টালমাটাল। মার্চে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও চাপে পড়ে। করোনার আঘাতে তৈরি পোশাক নির্ভর রপ্তানি আয় পুরোপুরি হোঁচট খায় এপ্রিলে। একের পর এক রপ্তানি ক্রয়াদেশ স্থগিত ও বাতিল হতে থাকে।

সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজে বাস্তবায়নে কিছুটা গতি ফিরে পায় পোশাক খাত। বছরের মাঝামাঝি সময়ে সুরক্ষা সামগ্রী রপ্তানি করে গার্মেন্ট খাতকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করা হয়। জুলাই থেকে রপ্তানি আয় ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। নভেম্বরে এসে রপ্তানি আয়ে টান পড়ে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায়। কমে গেছে বড়দিনের ক্রয়াদেশও। এ অবস্থায় বছরশেষে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর প্রথম চীনের উহানে করোনা ভাইরাসের লক্ষণের প্রথম রোগী শনাক্ত করে দেশটি। এ ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস বন্ধ ছিল চীনের সব প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পকারখানা। দীর্ঘসময় চীনে শিল্পকারখানা বন্ধ থাকায় কাঁচামাল সংকটে পড়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। এলসি খুলেও চীন থেকে সময়মতো কাঁচামাল পাননি উদ্যোক্তারা। এরপর গত এপ্রিলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লকডাউন শুরুর পর প্রায় সাড়ে চার হাজার কারখানার ৮৪ শতাংশে সরবরাহ বন্ধ ছিল। এ সময় প্রায় ৩২ লাখ ডলারের অর্ডার বাতিল বা স্থগিত হয়। বেশির ভাগ কারখানা অর্ডার বাতিল ও নিজ দেশের লকডাউনের কারণে পর্যাপ্ত কাজ না পাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করে। এর প্রতিবাদে বেশ কয়েকটি কারখানার পোশাক শ্রমিকরা বিক্ষোভও করে। এই অবস্থায় গত মার্চ থেকে জুলাই সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছিল ৩৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ৩ মাস প্রধান রপ্তানির বাজারে পোশাক রপ্তানি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু অক্টোবরে এসে আবারো উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।

অক্টোবরে ৬টি প্রধান দেশে পোশাক রপ্তানি কমেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমেছে ৮ শতাংশ, জার্মানিতে ১০ শতাংশ, স্পেনে ৬ শতাংশ, ফ্রান্সে ১৫ শতাংশ, ইতালিতে ৩০ শতাংশ ও জাপানে ২৮ শতাংশ। রপ্তানি আয় কমে যাওয়াকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাব হিসেবে দেখছে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থেকে গোটা অর্থনীতি বাঁচাতে গত এপ্রিলে সোয়া লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। এরমধ্যে রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য দেয়া হয় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এরপর আরো দুই দফায় তহবিলের আকার আরো ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে এ খাতে ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়। শর্ত ছিলÑ এ ঋণ ১৮ মাসে পরিশোধ করতে হবে। আর এর গ্রেস পিরিয়ড হবে ৬ মাস। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিজিএমইএ এ ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ১৮ মাস থেকে বাড়িয়ে ৫ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড ৬ মাস থেকে বাড়িয়ে ১২ মাস করার প্রস্তাব দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, বিজিএমইএর প্রস্তাবের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা চাওয়া হবে। তিনি যে নির্দেশনা দেবেন সেভাবে অর্থ বিভাগ সিদ্ধান্ত নেবে। বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. হাতেম ভোরের কাগজকে বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আলামত পেয়ে অনেক বিদেশি ক্রেতা আবারো অর্ডার ¯েøা করে দিয়েছেন। অনেকে স্থগিতও করছেন। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের প্রণোদনা প্যাকেজের ৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের মেয়াদ ও গ্রেস পিরিয়ড বাড়ানোর যৌক্তিকতা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে বিশ্ববাজারে অক্টোবর ও নভেম্বরে পোশাকের খুচরা বিক্রয় মূল্য ও চাহিদার বড় ধরনের পতন ঘটেছে। এর নেতিবাচক প্রভাবে দেশের পোশাক শিল্পের রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ও মূল্য উভয় কমেছে। এর আগেও করোনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী লকডাউনের কারণে ফেব্রুয়ারি থেকে পোশাকের মূল্য ও চাহিদা কমতে থাকে। এ ধারা এখনো অব্যাহত আছে। বিশেষ করে আগস্টে ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাকের মূল্য কমেছে ৫ শতাংশ। সেখানে সেপ্টেম্বরে আরো কমে ১৩ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে পোশাকের মূল্য কমেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও। সেপ্টেম্বরে পোশাকের বিক্রয় মূল্য যুক্তরাষ্ট্রে কমেছে ৯ শতাংশ। দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে অক্টোবরে এটি আরো কমে ১৩ শতাংশ হয়েছে। পোশাকের মূল্য পতনের তথ্য তুলে ধরে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা পরিস্থিতির আগ থেকেই পোশাকের মূল্য পতন হচ্ছে। যা করোনার মধ্যে তীব্র আকার ধারণ করেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৯Ñ এই ৫ বছরে দেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য হারিয়েছে গড়ে ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। করোনাকালে সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাপী পোশাকের মূল্য হারিয়েছে ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে পতন হয়েছে ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে এ পতন ধারা অব্যাহত রেখে অক্টোবরে বিশ্বব্যাপী দেশের পোশাকের মূল্য পতন ঘটে ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। আর নভেম্বরের প্রথম ২০ দিনে মূল্য পতন হয়েছে ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে নতুন শঙ্কা : বছরের শুরুতে বিশ্বব্যাপী মহামারীর ধাক্কায় মুখ থুবড়ে পড়া দেশের পোশাকখাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, বছরের শেষে বড়দিন ঘিরে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়লে বাংলাদেশের রপ্তানিতেও গতি আসবে বলে উদ্যোক্তারা আশা করছিলেন। কিন্তু সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ রপ্তানিকারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। কারখানা মালিকরা বলছেন, পণ্যমূল্য কমে যাচ্ছে, উৎপাদন খরচ যাচ্ছে বেড়ে। রপ্তানির পরিমাণও কমে যাচ্ছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের জন্য নতুন কার্যাদেশ এসেছে আগের বছরের তুলনায় কম।

এ বিষয়ে বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক ভোরের কাগজকে বলেন, রপ্তানির আকার বিবেচনা করলে এ খাত গত ২/৩ মাস ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যায়ে রয়েছে। তবে পণ্যমূল্যে বেশ ছাড় দিয়ে এ পরিস্থিতি ধরে রাখতে হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পোশাকের রপ্তানিমূল্য গত বছরের একেই সময়ের তুলনায় কমেছে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ। আর কেবল সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানিমূল্য কমেছে আগের বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। বর্তমানে পণ্যমূল্য কমে যাওয়াই রপ্তানিকারকদের বেশি বিপদে ফেলছে। রুবানা হক বলেন, এখন আবার পশ্চিমা দেশগুলোতে মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। ফলে রপ্তানির ভলিউমও কমছে। ক্রেতারা তাদের অর্ডার স্থগিত করে দিতে পারেন এই শঙ্কা রয়েছে। এসব ঘটনা ঘটলে কারখানাগুলোতে আবারও কর্মহীনতা সৃষ্টি হবে।

পোশাকে আশা জুগিয়েছে পিপিই রপ্তানি : করোনা মহামারির শুরুর দিকে পশ্চিমা ব্র্যান্ড একের পর এক অর্ডার যখন বাতিল করছিল তখন তৈরি পোশাক খাতের সম্ভাবনা টিকিয়ে রেখেছে পিপিই রপ্তানি। তৈরি পোশাক খাতের কিছু কারখানা মহামারি ধাক্কা সামলিয়ে মাস্ক, গøাভস, গাউন, পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) তৈরি ও রপ্তানি করে। মহামারি শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০টি কারখানা পিপিই তৈরি করছে। করোনার শুরুতে যেসব কারখানা সীমিত আকারে পিপিই তৈরি করছিল, তাদের অর্ডার বাড়তে থাকায় কারখানায় কাজও বাড়াতে হয়েছে উদ্যোক্তাদের। ফকির অ্যাপারেলসের পরিচালক মশিউর রহমান জানান, আমরা প্রচুর পরিমাণে সার্জিক্যাল গাউনের অর্ডার পেয়েছি। আমাদের সব কারখানা এখন পুরো বছরের কাজ পেয়ে গেছে।

করোনার কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি স্থবির হওয়ার পর এখন বেক্সিমকোর কারখানায় নীল-সাদা গাউনের ছড়াছড়ি। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী সৈয়দ নাভেদ হুসাইন বলেন, ফেব্রুয়ারিতেই আমরা এ সুযোগ আসবে বুঝতে পেরেছিলাম এবং সঙ্গে সঙ্গেই পিপিই তৈরিকে বিকল্প হিসবে বেছে নেই। ইতোমধ্যে বেক্সিমকো মার্কিন ব্র্যান্ড হানেসের কাছে প্রায় ৬৫ লাখ মেডিকেল গাউন রপ্তানি করেছে। এ বছর প্রায় ২৫ কোটি ডলার মূল্যের পিপিই রপ্তানির লক্ষ্য আছে তাদের। নাভেদ জানিয়েছেন, আমাদের ৪০ হাজার শ্রমিকের ৬০ শতাংশই এখন পিপিই তৈরির কাজ করছেন।

ভিয়েতনামের পেছনে পড়লেও ঘুরে দাঁড়ানোর আশা : করোনা ভাইরাস সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনামের পেছনে পড়ে গেলেও তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নন দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান এ খাতের উদ্যোক্তারা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আর ভিয়েতনাম ৩ হাজার কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বলে তথ্য দিয়েছে দেশটির পরিসংখ্যান দপ্তর। এর মধ্যে মহামারি শুরুর পর ২০২০ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) বাংলাদেশ ৯৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম রপ্তানি করেছে ১ হাজার ৫০ কোটি ৯১ ডলারের পোশাক।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, করোনাভাইরাস মহামারী কারণে সব দেশের রপ্তানিই কমেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে চীন। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪৯ শতাংশ। বাংলাদেশের কমেছে ১৮ শতাংশ। বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে যে ভিয়েতনাম দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে, তাদেরও এ ছয় মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। ভিয়েতনাম আমাদের থেকে এগিয়েছে, এটা নিয়ে আমরা মোটেই চিন্তিত বা বিচলিত নই। রপ্তানিতে কে বড়, কে ছোট সেটা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। আসল কথা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি। গ্রোথ হচ্ছে কি না, টার্গেট (লক্ষ্যমাত্রা) পূরণ হচ্ছে কি না- সেটাই বড় কথা।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/দু

Sharing is caring!