নিজস্ব প্রতিবেদক :

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সাময়িক বন্ধ ছিল রাজধানীর মোহাম্মদপুর টিকাদান কেন্দ্র। সরকারের ঘোষিত সাধারণ ছুটি শেষে জুনে খুলে দেয়া হয় এই কেন্দ্র।

শুরুর দিকে এখানে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন টিকা নিতে এলেও বর্তমানে ১২০ থেকে ১৫০ জন টিকা নিতে আসছেন। অর্থাৎ, আগের রূপে ফিরেছে এই কেন্দ্রের টিকা দান কার্যক্রম। একই চিত্র দেশের প্রায় সবগুলো টিকা কেন্দ্রের।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মা, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচি সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি ১ লাখ ২০ হাজার ৫০০ টিকা কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, পোলিও, যক্ষা, হাম ও রুবেলা, হেপাটাইটিস-বি ও ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ ১০ ধরনের রোগ প্রতিরোধের জন্য শিশু জন্মের পর থেকে ১৫ মাসের মধ্যে ছয়টি টিকা দেয়া হয়।

চলতি বছর ৩৭ লাখেরও বেশি (৯৯ শতাংশ) নবজাতককে টিকা দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়। তবে করোনার কারণে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ কম হয়েছে টিকাদান।

গত পাঁচ মাসে এই কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক হয়েছে। জুনের পর সরকারঘোষিত সাধারণ ছুটি শেষ হলে তখন থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে টিকা দেয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা মহামারি ও ৫ দফায় দীর্ঘমেয়াদী বন্যায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে সরকারের উদ্যোগে টিকাদানের হার স্বাভাবিক হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, করোনা সংক্রমণ শুরুর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যক্ষ্মা প্রতিরোধী বিসিজি টিকার লক্ষ্য পূরণ হয়েছিল ৯১ দশমিক ৩ শতাংশ। এপ্রিলে এসে তা কমে হয় ৪৯ শতাংশ। বর্তমানে আবার তা ৯২.০৯ শতাংশে এসেছে।

হাম ও রুবেলা প্রতিরোধী টিকা গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ডোজ লক্ষ্যমাত্রার ৭৬ দশমিক ৭৭ ও দ্বিতীয় ডোজ ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ দেয়া হয়। তবে দুই ডোজ মিলে লক্ষ্যমাত্রার ৭৭ দশমিক ৫১ শতাংশ শিশু হাম ও রুবেলার টিকা নিয়েছে।

আগামী ১২ ডিসেম্বরে থেকে ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে এ টিকা আবার দেয়া শুরু হবে। নয় বছরের কম বয়সী ৩ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে প্রথম ডোজ টিকা দেয়া হবে। এ কার্যক্রম চলবে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।

একই অবস্থা নিউমোনিয়া প্রতিরোধে টিকার। করোনার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১ দশমিক ৬৩ শতাংশ পিছিয়ে থাকলেও বর্তমানে লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

পোলিও রোগ প্রতিরোধে টিকা কার্যক্রম লক্ষ্যমাত্রা থেকে ২৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ পিছিয়ে থাকলেও বর্তমানে ৯৭ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। হেপাটাইটিস-বি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-সিসহ পাঁচটি রোগ প্রতিরোধে পেনটা নামক একটি অভিন্ন টিকা দেয়া হয়।

করোনা সংক্রমণের ভয়ে অভিভাবকেরা টিকা নিতে না আসার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পিছিয়ে ছিল এ টিকাদান। এখন তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে।

এদিকে করোনা সংক্রমণের মধ্যে ব্যাহত টিকা কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া ও লক্ষ্যমাত্রা পূরণের এই অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছে ইউনিসেফ।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের উপপ্রতিনিধি ভিরা মেন্ডোনকা বলেন, করোনার মধ্যে টিকার লক্ষ্যমাত্রা স্বাভাবিকে নিয়ে আসা সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন এবং এটি নিঃসন্দেহে হাজার হাজার শিশুর জীবন বাঁচাবে। এ গতি যাতে বজায় থাকে এবং কোনো শিশু যাতে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করার জন্য টিকাদান প্রচেষ্টায় সহায়তা অব্যাহত রাখতে ইউনিসেফ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এই সংকট কাটিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গত জুনে দিল্লিতে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। বৈঠকে ১১টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করে। সেখানে টিকাদানের নতুন রোডম্যাপ তৈরি করা হয়। সে অনুযায়ী এখন টিকা কার্যক্রম চলছে।

এ বিষয়ে শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান সাঈদা আনোয়ার নিউজবাংলাকে বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে কিছুদিন হয়তো টিকা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তবে আবার স্বাভাবিক হয়েছে।

তিনি বলেন, করোনা আতঙ্কে অনেক অভিভাবক তার শিশুকে টিকাকেন্দ্র নিয়ে আসেননি। এ কারণে হয়তো কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছিল টিকা কার্যক্রম। তবে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের যথাযথ পদক্ষেপে আবার স্বাভাবিক হয়েছে টিকা কর্মসূচি।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য বিভাগের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির পরিচালক শামসুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ৬৪টি জেলার মধ্যে ২২টি জেলায় টিকাদান কাভারেজ ৫০ শতাংশ কমে আসে। বাকি জেলাগুলোতেও ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত কাভারেজ করা সম্ভব হয়।

তিনি জানান, জুন থেকে বাদ পড়া শিশুদের তালিকা তৈরি করে সেই শিশুদের টিকা প্রদানের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/বি

Sharing is caring!