নিজস্ব প্রতিবেদক :

পড়াশোনা শেষ করে একটি বায়িং হাউজে জব নিয়েছিলেন সিয়াম। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই করোনার প্রাদুর্ভাবে চাকরিটা চলে যায় তার। ঢাকায় দুইমাস থাকার মতো সক্ষমতা নেই। লোকলজ্জায় গ্রামেও ফিরতে পারছিলেন না। অবশেষে স্বল্প পুঁজিতে শুরু করেছেন অনলাইন ব্যবসা। তারই মতো চাকরি হারান গণমাধ্যমে কাজ করা পারভেজ। চলমান এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে তিনিও চালু করেন অনলাইন ফুড ডেলিভারি। আরেক গণমাধ্যমকর্মী সাজ্জাদ চাকরির পাশাপাশি অনলাইনে করছেন মধু, সরিষার তেল, কালো জিরাসহ বিভিন্ন মসলার ব্যবসা।

করোনার কারণে কর্ম হারিয়ে শহর থেকে যখন অনেকে চলে যাচ্ছেন গ্রামে; ঠিক তখন কিছু মানুষ অনলাইন প্লাটফর্মকে বেছে নিচ্ছে তাদের বেঁচে থাকার নতুন অবলম্বন হিসেবে।

‌‌‘নদীর এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে’ করোনায় কর্ম হারানোর গল্পটাও যেন অনেকটাই এমনই। করোনার ফলে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক শিল্প-প্রতিষ্ঠান। আবার উন্মুক্ত হচ্ছে অনেক কর্মের দ্বার। অনলাইন কেন্দ্রিক ব্যবসার প্রসার বৃদ্ধির অন্যতম উদাহরণ দেশের কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যস্ততা।

দেশে যখন অফিসগুলোতে চলছে কর্মী ছাঁটাই তখন কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো দিচ্ছে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। করোনায় ঘরবন্দি মানুষের খাদ্য ও পণ্যের চাহিদা পূরণে মানুষ অনলাইনে অর্ডার দিচ্ছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। আর এসব পণ্য ডেলিভারি দিচ্ছে কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো। তাই স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তাদের অনেক বেশি লোকবলের প্রয়োজন হচ্ছে।

ডেইলি বাংলাদেশকে কুরিয়ার সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ও সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান পুলক জানান, করোনায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তাদের পণ্য ডেলিভারির পরিমাণ বেড়েছে। বিশেষ করে ফলের মৌসুমে এমনিতেই তাদের কর্মব্যস্ততা বাড়ে। তার উপর এখন মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়ায় অন্যান্য পণ্যের সরবরাহের অর্ডারও বেড়েছে। তাই কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন করে লোক নিয়োগ দিতে হচ্ছে।

গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ করে সংসার চালাতেন জামিল আহমেদ। তিনি দেশের ভেতরেই ফ্রিল্যান্সিং করতেন। কিন্তু করোনায় বন্ধ হয়ে যায় তার কাজ। উপায় না পেয়ে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেয় হোম মেইড খাবার সরবরাহের। সেই সূত্রে জানতে পারেন ফার্মগেটে একটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের কর্মকর্তাদের জন্য হোম মেইড খাবারের জন্য সোর্স খুঁজছেন। যোগাযোগ করেন জামিল আহমেদ। মাকে দিয়ে বানান খাবার স্যাম্পল। কর্তৃপক্ষ তা একসেপ্টও করে। প্রতিদিন ৩ বেলা মোট ৯০ জনের খাবার সরবরাহ করে মাসে তার এখন লাভ থাকে ৫০ হাজার টাকারও বেশি।

করোনায় ঘরবন্দি হয়ে থাকা মানুষ বিনোদনের জন্যও এখন নির্ভরশীল অনলাইন প্লাটফর্মের উপর। দেশে একদিকে যখন পত্রিকা থেকে লোক ছাঁটাই চলছে তখন হু হু করে বাড়ছে টিভি ও ইউটিউবের দর্শক।

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা আসাদ আল হোসেন একসময় কাজ করতেন বেসরকারি টিভি চ্যানেলে ভিডিও এডিটর হিসেবে। বছর খানেক আগে চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুর করেন ফ্রিল্যান্সিং। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে ৩০ জনেরও বেশি কর্মী। করোনার সময়ে তিনি আরেকটি অফিস ভাড়া নিয়েছেন। দিচ্ছেন নতুন কর্মী নিয়োগ। জানালেন, তিনি ইউরোপ, আমেরিকার শীর্ষ বেশ কয়েকটি ইউটিউব চ্যানেলের জন্য ভিডিও এডিটিং করেন। করোনাকালীন সময়ে এসব চ্যানেলগুলো থেকে তিনি প্রচুর কাজ পাচ্ছেন। ফলে তাকে নতুন করে কর্মী নিয়োগ দিতে হচ্ছে।

করোনা এভাবে অনেক মানুষের কাজ কেড়ে নিলেও সৃষ্টি হচ্ছে নতুন কাজের ক্ষেত্র। বিশেষ করে তথ্য-প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে বাড়ছে এ সম্ভাবনা। এ প্রসঙ্গে প্রযুক্তি বিষয়ক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বেসিসের নেতা সামসুদ্দোহা বলেন, করোনার কারণে যখন অনেক মানুষ কাজ হারাচ্ছে তখন প্রযুক্তি নির্ভর খাতগুলো নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। এর ফলে লাভবান হচ্ছে অনেকেই। কারণ একটি পণ্য তৈরি থেকে তা বিপণন এবং ভোক্তার হাতে পৌঁছে দেয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই জড়িয়ে পড়ছেন এই ব্যবসার সঙ্গে।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/রা

Sharing is caring!