নিজস্ব প্রতিবেদক :

শীতে করোনা মহামারির তীব্রতা বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কা আগেই করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছিলেন সংশ্লিষ্টদের। সেই আশঙ্কাই সত্য হতে চলেছে। দেশে তাপমাত্রা যত কমছে; ততই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চললে সংক্রমণের হার আরো বাড়বে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সংক্রমণ বাড়লেও মৃত্যুর হার এখনো তেমন বাড়েনি। উল্লেখ্য, প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা পাওয়া যায় আরো আগেই। গতকাল সোমবার ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল ৩১ দশমিক ৮ ডিগ্রি। তবে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ছিল ১৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি। এছাড়া দেশের অধিকাংশ এলাকায় তাপমাত্রা গড়ে ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রির ঘরে ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, দেশে গত এক দিনে নতুন করে আরো ২ হাজার ১৩৯ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। আর এই সংখ্যাটি গত ৭০ দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এর আগে এর বেশি নতুন রোগী শনাক্তের খবর এসেছিল গত ৭ সেপ্টেম্বর। সেদিন ২ হাজার ২০২ জন রোগী শনাক্তের তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর গত ২৪ ঘণ্টায় এ ভাইরাসে আরো ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জানতে চাইলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ ভোরের কাগজকে বলেন, শীতের কারণে সংক্রমণ বাড়ছে। মানুষ যদি ঠিকঠাক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলত, তাহলে করোনা নিয়ে এত দুশ্চিন্তা থাকত না। কিন্তু জনগণের করোনা নিয়ে শৈথিল্যভাব, রোগটিকে ভয় না পাওয়া, যা হয় হবে- এমন মনোভাবসহ স্বাস্থ্যবিধি না মানায় সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে। তবে মৃত্যুহার কম থাকা কিছুটা স্বস্তিদায়ক। সব মিলিয়ে সংক্রমণ বাড়লেও মৃত্যু সংখ্যা বাড়ছে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেও করোনার সংক্রমণও ঠেকানো যাবে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শীতে করোনার প্রকোপ বাড়বেÑ কথাটি গত কিছুদিন ধরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক থেকেও শীতকালে করোনার প্রকোপ ঠেকাতে নানা পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানানো হয়েছে। সচিবালয়ে অবস্থিত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ‘নো মাস্ক নো ওয়ার্ক’ শিরোনাম দিয়ে নির্দেশিকাও জারি করা হয়েছে। গতকাল সোমবার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, মহামারি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের বিষয়ে মানুষকে আরো সতর্ক ও সচেতন করার উদ্দেশ্যে কঠোর হচ্ছে সরকার। সাধারণ মানুষকে মাস্ক পরানোসহ সচেতনতা বাড়াতে রাজধানীতে শুরু হবে অভিযান, পরিচালনা করা হবে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে গতকাল সংশ্লিষ্টদের বলে দেয়া হয়েছে। দুএক দিনের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করবে।

মাঝখানে খানিকটা থেমে আবার কেন করোনার সংক্রমণ বাড়ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, শুরু থেকেই আমাদের দেশে করোনা থেমে ছিল না। টেস্ট কম থাকার কারণে সংক্রমণের হারও কম ছিল। এখন টেস্ট বেড়েছে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনাও। ওই কর্মকর্তা বলেন, শীতকালে করোনা বাড়তে পারে- তা আগেই বলা হয়েছিল। শীতের শুরুতে কেবল তাপমাত্রা নামতে শুরু করেছে, আর এমনিই করোনাও বাড়তে শুরু করেছে।

শীতে করোনা বাড়তে থাকার কারণ জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, শীতে এমনিতেই জ্বরসহ নানা সংক্রামক রোগ হয়ে থাকে। আর এখন করোনার প্রকোপ থাকায় শীতকালীন জ্বর আরো মানুষের শরীরে পোক্ত হয়ে বসছে। এর ফলে যাদের জ্বর ৩ দিনেও কমছে তারাই যখন পরীক্ষা করাচ্ছেন তারাই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এছাড়া মাঝখানে টেস্ট বন্ধ থাকায় সংক্রমণের ঠিকঠাক চিত্র পাইনি। আমরা ভেবেছি সংক্রমণ কমে আসছে। কিন্তু এখন যখন শীতকালীন জ্বর শুরু হওয়ার পাশাপাশি করোনার টেস্টও বাড়ছে তখন সংক্রমণের হারও বাড়ছে।

আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, করোনার সংক্রমণ কোথায় বেশি, কোথায় কম- এসব নিয়ে কোনো ‘জোন’ করা হয়নি। এর ফলে ঘরে ঘরে ভাইরাসটি রয়েই গেছে। আর আমাদের দেশে মৃত্যু কম থাকায় করোনা থেকে ভয়ভীতি কমে গেছে মানুষের। তিনি বলেন, এই শীতে করোনা সংক্রমণ কিছুটা বাড়বে। আগামী এপ্রিল/মের দিকে কিছুটা কমে আসবে। তারপর কখনো কমবে আবার কখনো বাড়বেÑ এই করে আগামী দুবছর চলবে। তারপর এমনিতেই কমে আসবে। তবে তার আগে যদি ভ্যাকসিন চলে আসে তাহলে পরিস্থিতি হবে ভিন্ন।

এদিকে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী-এমপি-সচিবসহ করোনায় আক্রান্ত ভিআইপির সংখ্যা বাড়ছে। এরইমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মন্ত্রিসভার সদস্য, সাবেক মেয়র, বর্তমান সংসদের দুজন এমপি, সিনিয়র সচিবসহ অনেক ভিআইপি মারা গেছেন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকায় শুরুতে তুলনামূলকভাবে অন্য শ্রেণিপেশার মানুষ বেশি আক্রান্ত হলেও এখন সেই তালিকায় বিশিষ্টজনরাও চলে আসায় দেশজুড়ে উদ্বেগ-আতঙ্কের মাত্রা বাড়ছে। করোনায় আক্রান্ত ভিআইপিদের তালিকায় গতকাল সংযুক্ত হয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আব্দুস সালাম। কিছুদিন ধরে সচিবের শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিলে তিনি গত রবিবার করোনা পরীক্ষা করান। গতকাল সোমবার তার রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। গতকাল শ্রম ও কর্মস্থান মন্ত্রণালয় থেকে এক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলা হয়েছে, শারীরিক দুর্বলতা ছাড়া শ্রম সচিবের অন্যকোনো উপসর্গ নেই। তিনি বাড়িতে নির্জনবাসে রয়েছেন। অন্যদিকে গ্রামের মানুষদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত প্রায় নেই বললেই চলে। ঢাকা মহানগরসহ শুধু বড় বড় শহরেই এই রোগের আক্রমণ বেশি।

গ্রামে কম, শহরে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি প্রথম দিকে আমাদেরও ভাবিয়েছে। পরে আমরা যখন একটি সমীক্ষা করি তখনই আসল চিত্র বেরিয়ে আসে। তিনি বলেন, গ্রামের মানুষ পরিশ্রম করার পাশাপাশি শরীরে সূর্যের আলো বেশি নিচ্ছেন। এর ফলে তাদের শরীর এক ধরনের ভাইরাস প্রতিরোধক হয়ে উঠছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে গিয়েও তাদের শরীর ভাইরাস প্রতিরোধক হয়ে উঠছে। এর ফলে করোনা তাদের কাবু করতে পারেনি। একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, যারা স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও তুলনামূলক ঠাণ্ডা ঘরে থেকেছেন এবং পরিশ্রম করেন না- এমন লোকই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/দু

Sharing is caring!