নোয়াখালী প্রতিনিধি :
কখনো পায়ে হেটে, কখনো রিক্সায় কিংবা কখনো মোটরসাইকেলের পিছনে চড়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে প্রতিনিয়ত ছুটে চলেন রোগীর বাড়ি বাড়ি। পুরুষ শাসিত এই সমাজে স্বামী নেয় তবুও নিজেকে অসহায় মনে করেননা তিনি। গ্রামের অসহায় সাধারন মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে জীবনের বাকী অংশ পার করে দিতে চান ৪০ বছর বয়সী পল্লী চিকিৎসক ফাতেমা বেগম।

সরেজমিনে পল্লী চিকিৎক ফাতেমা সম্পর্কে জানতে চাইলে বুড়িরচর বড়পোল এলাকার চরআমান উল্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা তাছলিমা বেগম (৩০) বলেন, চিকিৎসার ক্ষেত্রে ফাতেমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি ছোট হলেও আছে ১৬ বছরের অভিজ্ঞতা। হাতিয়ার বুড়িরচর ইউনিয়নের অজয় পাড়া কয়েকটি গ্রামের নারীদের চিকিৎসা সেবার একমাত্র অবলাম্বন হয়ে উঠেছে পল্লী চিকিৎসক ফাতেমা। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ফাতেমা রোগীকে কখনো নিজে বা কখনো রোগীর সাথে গিয়ে উপজেলা সদরে নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন।
নোয়াখালী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বুড়িরচর ইউনিয়নের বত্তা মার্কেটের রাস্তার পাশে ছোট একটি টিনসিড ঘরে ফাতেমার ফার্মেসী দোকান। এই দোকানে বসে দিনে সকাল ও বিকাল দুই সময়ে রোগী দেখেন ফাতেমা।
কর্মজীবনে প্রথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হলেও মৎস্য চাষ, হাঁস মুরগী পালন ও অন্যান্য ব্যবসার সাথে জড়িত ফাতেমা। তবে এসব পেশার মধ্যে নিজেকে পল্লী চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি।
পল্লী চিকিৎসক ফাতেমা বলেন, তাঁর পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম সারওয়ার ছিলেন স্বাস্থ্য সহকারী। সেই সময় গ্রামের অসহায় মানুষকে বিভিন্ন রোগব্যাধী নিয়ে তার পিতার কাছে আসতে দেখে তার চিকিৎসাসেবা করার ইচ্ছা জাগে। সেই থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ২০০২ সালে ঢাকাতে দুই বছর মেয়াদি ডি.এম.এ প্রশিক্ষণ ও একটি গাইনি বিষয়ে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন।
এরপর থেকে ফাতেমা স্থানীয় বত্তা মার্কেটে ফার্মেসীতে বসে পল্লীচিকিৎসা দিয়ে আসছেন। ব্যক্তি জীবনে ফাতেমা এক সন্তানের জননী। ২০১৭ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর কিছুটা থমকে যায় জীবনের গতি। কিন্তু অধম্য ফাতেমা থেমে নেই। একমাত্র কন্যাকে বিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ক্রয় করেছেন কয়েক বিঘা জমি। তৈরী করেছেন পরিপূর্ণ আধুনিক সুবিধা সম্বলিত একটি বাড়ি। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি দিনের অবসর সময় টুকু ব্যয় করেন হাঁস,মুরগি পালন ও নিজের মাছের খামারে।
বুড়িরচর দক্ষিণ রেহানিয়া গ্রামের আফছার উদ্দিন (৪৫) বলেন , প্রতিদিন নিজের চেম্বারে ও বাড়িতে গিয়ে ৪০/৫০জন রোগী দেখেন ফাতেমা। এরমধ্যে অধিকাংশ মহিলা রোগী। গ্রামের রোগীরা বা তাদের অভিবাকরা ফাতেমাকে নারী ভাবেননা ভাবেন চিকিৎসক হিসাবে। গভীর রাতে মোবাইলে কল করেও ডেকে নেন ফাতেমাকে। এই ক্ষেত্রে নিজের পরিবারের দুই-তিনজন পুরুষ সাথে গিয়ে ফাতেমাকে সহযোগীতা করেন প্রতিনিয়ত।
ফাতেমা ডাক্তারের চেম্বারে চিকিৎসা নিতে আসা রেহানিয়া গ্রামের বিনা রানী নাথ (৬০) নামে এক বৃদ্ধা বলেন, প্রতিনিয়ত তিনি ফাতেমা ডাক্তারের চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে আছেন। তার বাড়ি থেকে উপজেলা সদর অনেক দুরে হওয়ায় সেখানে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন না তিনি। শুধু তিনি নয় তার পরিবারের সকল সদস্যের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন এই ফাতেমা ডাক্তার।
মাঝে মাঝে পুরুষ শাসিত সমাজে গ্রামের অন্য পল্লী চিকিৎসকদের থামিয়ে রাখার অপচেষ্টা মোকাবিলা করতে হয় ফাতেমাকে। চলার পথে বিভিন্ন সময় নারীর প্রতি পুরুষের লোভনীয় অস্বাভাবিক শব্দ শুনেও তাকে চলতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এটাকে এখন নিয়ম মেনে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ফাতেমা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার ইউছুফ সোহাগ বলেন, ফাতেমা একজন নারী। সে গ্রামে থেকে পুরুষ মহিলা সবাইকে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে জটিল কোন রোগী আসলে মোবাইলে সে (ফাতেমা) আমার সাথে পরামর্শ করে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। একজর নারীর ক্ষেত্রে বর্তমান সমাজে এ ধরনের দৃষ্টান্ত বিরল।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/বি

Sharing is caring!