নিজস্ব প্রতিবেদক :

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ এবং কার্যকর একটি ভ্যাকসিন পেতে মরিয়া পুরো বিশ্ব। ভ্যাকসিন পেতে নানা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশও। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন জটিলতা। কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ভ্যাকসিন সংরক্ষণে তাপমাত্রা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। আবার কোনো ভ্যাকসিন রপ্তানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা ভ্যাকসিন প্রাপ্তির পথকে ক্রমশই যেন সংকুচিত করে দিচ্ছে।

অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন রেফ্রিজারেটরের সাধারণ তাপমাত্রাতেই সংরক্ষণ করা যায়; ফলে যে কোনো জায়গায় এই ভ্যাকসিন পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ। এ কারণে অনেক দেশেরই এ ভ্যাকসিন নিয়ে আগ্রহ বেশি। তবে ৩ জানুয়ারি সিরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত অক্সফোর্ড-এস্ট্রোজেনকার করোনা ভ্যাকসিন রপ্তানিতে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞা আরোপের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর পুরো বিশেশ্বেই এর প্রভাব পড়ে। ভারত থেকে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আসা নিয়ে অনিশ্চয়তার খবরে বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলেও নানা উদ্বেগ ও কৌতূহল তৈরি করেছে। কারণ ৩ কোটি ডোজ করোনা ভ্যাকসিন পেতে গত ৫ নভেম্বর সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন পাঠাবে প্রতিষ্ঠানটি। ভ্যাকসিন রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের খবর প্রকাশের ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই গতকাল সোমবার সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ব্যক্তিদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে বেক্সিমকো ফার্মাও। তবে এমন খবরে যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, তা নাকচ করে দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা।

দুপুরে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ হয়েছে। ভারতের ওই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। বরং আগে যেভাবে প্রক্রিয়া চলছিল সেই প্রক্রিয়া অনুসারেই জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকের মধ্যে বাংলাদেশে ভ্যাকসিন আসবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সিরামের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে তা একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। আশা করছি, সিরামের সঙ্গে চুক্তি ব্যাহত হবে না এবং চুক্তি অনুযায়ী আমরা ভ্যাকসিন পাব। এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।

মন্ত্রী জানান, সিরামের টিকার অনুমোদন দিয়েছে ভারতের সরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেতে আরো তিন সপ্তাহের মতো সময় লাগবে। তাই বাংলাদেশে টিকা আসার যে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, সে সময়ই টিকা আসবে। ভারতকে ভ্যাকসিন দেয়া বাবদ টাকা পাঠানোর সব কাজ শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার (আজ) চুক্তি অনুযায়ী অর্ধেক টাকা অর্থাৎ ১২০ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হবে। ভারতীয় দূতাবাস থেকে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে, ভারত সরকার ভ্যাকসিন নিষিদ্ধ করেছে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে সরকারি পর্যায়ে। এখানে কোনো বাধা নেই।

বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ভ্যাকসিন আনার বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের উচ্চ পর্যায় থেকে কথা হয়েছে, তাই এটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। ‘যথাসময়েই’ বাংলাদেশ করোনার ভ্যাকসিন পাবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এমন কথাই জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে বিকালে গুলশানে এক সংবাদ সম্মেলনে বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন জানান, নিষেধাজ্ঞা জারির আগে চুক্তি হওয়ায় সিরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে ভ্যাকসিন পেতে বাংলাদেশের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিকে অগ্রিম অর্থ এবং দেশে ভ্যাকসিনটির নিবন্ধন দেয়া হলে বাংলাদেশ সময়মতোই এই ভ্যাকসিন পাবে। তিনি বলেন, ভারত সরকার সিরামকে যেভাবে ভ্যাকসিন রপ্তানি করতে নিরুৎসাহিত করেছে, তা যৌক্তিক। তবে আমাদের সঙ্গে সিরামের যে চুক্তিটি হয়েছে, তা একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। এ ধরনের চুক্তি বাতিল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশ এই ভ্যাকসিনের রেজিস্ট্রেশন দিলে এক মাসের মধ্যে ভ্যাকসিন চলে আসবে। এটি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা দেখছি না।

পাপন আরো বলেন, করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কারণে ভারত করোনা চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট ওষুধের কাঁচামাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। আমরা কিন্তু ওই সময়ও এসব কাঁচামাল এনেছি। কারণ আমাদের সঙ্গে তাদের চুক্তি ছিল আগে থেকেই। আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত আমাদের যে চুক্তিটি হয়েছে, তা ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসবে না। আমরা যথা নিয়মে ভ্যাকসিন পাব।

দিল্লি থেকে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সিরাম প্রধানের যে বক্তব্য গণমাধ্যমে এসেছে তা আমাদের নজরে এসেছে। তাতে প্রতিবেশী বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ, ভারত বরাবরই প্রতিবেশীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় নিয়ে থাকে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। বাংলাদেশের জনগণ প্রথম থেকেই ভ্যাকসিন পাবে।

প্রসঙ্গত; আন্তর্জাতিক এক গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সিরাম ইনস্টিটিউটের সিইও আদর পুনাওয়ালার বরাত দিয়ে রবিবার রাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, কয়েক মাসের জন্য ভ্যাকসিন রপ্তানির অনুমতি দেবে না ভারত। ভারতীয়রা যাতে যথাযথভাবে ভ্যাকসিন পায় সেজন্য এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তার ওই বক্তব্যের পর বাংলাদেশে সময়মতো ভ্যাকসিন পাওয়া নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

আর গতকাল সিরাম ইনস্টিটিউটের জনসংযোগ কর্মকর্তা মায়াঙ্ক সেন আন্তর্জাতিক এক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভ্যাকসিন রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ তাদের ভ্যাকসিন রপ্তানির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে কোম্পানিটি এখন অন্য দেশে টিকা রপ্তানির অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেÑ যা পেতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। রপ্তানি শুরুর আগেই তারা ভারত সরকারকে ১০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন দেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তারা তা করতে পারবে না, যেহেতু তাদের রপ্তানির অনুমতি নেই।

এদিকে মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আব্দুল মান্নান সিরামের সঙ্গে চুক্তিটিকে জি-টু-জি (দুই দেশের সরকার পর্যায়ের চুক্তি) বলে উল্লেখ করেন। যা নিয়ে আরেক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তবে বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান জানান, চুক্তিটি কোনোভাবেই জি-টু-জি নয়। তিনি বলেন, আমাদের এই চুক্তি জি-টু-জি নয়। এই চুক্তিতে সিরাম একটি পক্ষ, বেক্সিমকো একটি পক্ষ, বাংলাদেশ সরকার একটি পক্ষ। এটি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। এই চুক্তি অনুযায়ী সিরাম ভ্যাকসিন উৎপাদন করবে, বাংলাদেশ সরকার ভ্যাকসিনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও টাকা দেবে। আর বেক্সিমকো সিরামের কাছ থেকে এই ভ্যাকসিন বাংলাদেশে নিয়ে আসবে।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/বি

Sharing is caring!