নিজস্ব প্রতিবেদক :

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর নতুন করে বিতর্ক উঠেছে আইনটি নিয়ে। এ আইন বাকস্বাধীনতার প্রতিবন্ধক অভিযোগ করে পুরো আইনটিই বাতিলের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

তবে একটি অংশের দাবি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুরোপুরি বাতিল নয়, সংশোধন করতে হবে এর বিতর্কিত ধারাগুলো। তারা বলছেন, আইনটির অপপ্রয়োগের যে অভিযোগ উঠছে, সেটা বন্ধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো বাতিল করতে হবে। এ আইনের সব মামলা ‘জামিনযোগ্য’ করার দাবিও তাদের।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ২৫ ও ৩১ ধারা দুটি কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে এক বছর আগে রুল দিয়েছিল হাইকোর্ট। সেটি এখনও বিচারাধীন।

তথ্য যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন-২০০৬-এর বিতর্কিত ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা বিলুপ্ত করে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন আর্টিকেল-১৯-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এরপর থেকে এ আইনে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ১৯৮টি মামলায় ৪৫৭ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার মধ্যে সংবাদকর্মীর সংখ্যা ৭৫।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে গত বছর আইনটির চারটি ধারা (২৫, ২৮, ২৯, ৩১) বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন সাংবাদিক, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ ৯ জন। এসব ধারা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থি উল্লেখ করে তা বাতিলের নির্দেশনা চান রিটকারীরা।

তবে হাইকোর্ট ২৫ ও ৩১ ধারা দুটি কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে এক বছর আগে রুল জারি করে। বিষয়টি এখনও বিচারাধীন।

কী আছে ২৫, ২৮, ২৯, ৩১ ধারায়

ডিজিটাল নিরাপত্তার আইনের ২৫ ধারায় ‘আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ ইত্যাদি’ অপরাধ ও দণ্ড প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,

২৫। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে,-

(ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা

(খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে, অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন,

তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

এই আইনের ২৮ ধারায় ‘ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার ইত্যাদি’ অপরাধ ও দণ্ড প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,

২৮। (১) যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করিবার বা উস্কানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যাহা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ২০ (বিশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

আইনের ২৯ ধারায় ‘মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার, ইত্যাদি’ অপরাধ ও দণ্ড প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,

২৯। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে Penal Code (Act XLV of 1860) এর section 499 এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩১ ধারায় ‘আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ইত্যাদির অপরাধ ও দণ্ড’ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,

৩১। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যাহা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৭ (সাত) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ধারার বিষয়ে জানতে চাইলে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারক বিচারপতি নিজামুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধন হওয়া দরকার। যেসব ধারায় জামিন দেয়া যাবে না বলা আছে, এটা বলা ঠিক না। জামিন দেবেন কি দেবেন না এটা আদালত ঠিক করবে। এই ধারাগুলো সংশোধন হওয়া দরকার।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ আইনটির অপব্যবহার করা হচ্ছে। আইনটি যে উদ্দেশ্য করা হয়েছিল, তা ব্যাহত হচ্ছে। আইনটি রিভিউ করে সংশোধন করা উচিত।’

সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী মানবাধিকারকর্মী জেড আই খান পান্না নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আইনটি অপপ্রয়োগ হচ্ছে। সমাজে ওয়াজের নামে অশ্লীল-অশালীন কথাবার্তা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে একটিও মামলা হচ্ছে না। সেটা কারও চোখে পড়ছে না। যেটা সমাজের ক্ষতি করে, ধর্মের ক্ষতি করে, মানবতার ক্ষতি করে সেটা এ আইনে আসে না। এখন আমরা কিছু সত্য কথা বলতে গেলে সেটা আমলা-কামলাদের চোখে পড়ে। এখানে আসলে আমলাদের স্বার্থটা বেশি।’

আইনটির বিরুদ্ধে সংবাদকর্মীদের ‘দুর্বল অবস্থানের’ সমালোচনা করেন জেড আই খান পান্না। তিনি বলেন, ‘এখানে সাংবাদিক সমাজেরও দুর্বলতা আছে। তারা সেভাবে এর প্রতিবাদ করে না। এ আইন যদি সাংবাদিকতা এবং বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে হয় তাহলে এ আইনের প্রয়োজনীয়তা কী!’

তবে সাংবাদিকদের ‘দুর্বল অবস্থান’ এর অভিযোগ মানছেন না ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, এ আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই আমরা প্রতিবাদ করছি। পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য অপপ্রয়োগ হচ্ছে এ জন্য এ আইন বাতিলের দাবি করছি।’

তিনি বলেন, ‘এ আইনটি যে উদ্দেশ্য সরকার করেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার যথেচ্ছ অপব্যবহার হচ্ছে। পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে যারা কাজ করেন, এ আইন দিয়ে তাদের নিবৃত্ত করা হচ্ছে সাংবাদিকতার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। আমরা সাংবাদিকেরা যা তথ্যপ্রমাণ পাই তার আলোকে লিখি। এ ক্ষেত্রে অজামিনযোগ্য মামলা করার নিন্দা জানাই, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন ইউটিউব, ফেসবুক, যেগুলো আনএডিটেড, অনিয়ন্ত্রিত সেসব বিষয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নাই। সেগুলোর জন্য যদি আরও কিছু প্রয়োগ করে তাতেও আমাদের কোনো আপত্তি নাই।’

‘আমরা কী করতে পারব, কী পারব না সেটা যখন নিবন্ধন দেয়া হয় সেখানে বলা থাকে। এর বাইরে আমাদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল আইনের অপপ্রয়োগের নিন্দা জানাই।’

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মুরসালিন নোমানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ আইনটি শুরু থেকেই সাংবাদিক সমাজ গ্রহণ করেনি। যে আশঙ্কায় সাংবাদিক সমাজ গ্রহণ করেনি, এখন সেভাবেই প্রয়োগ হচ্ছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো সংশোধন করা উচিত। ’

ডিজিটাল নিরাপত্তার আইনের চারটি ধারা চ্যালেঞ্জ করে রিটকারীদের আইনজীবী শিশির মনির নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মামলাটি শুনানির জন্য এ সপ্তাহেই আদালতে উপস্থাপন করব। এরপর আদালত দিন ধার্য করলেই শুনানি হবে।’

তিনি বলেন, ‘এর আগে উপস্থাপন করেছিলাম। তখন আদালত বলেছিল, নিয়মিত কোর্ট চালু হলে যেতে। এখন আবার আদালতে উপস্থাপন করা হবে।’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সরকারের অবস্থানের বিষয়ে শনিবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দেখেন এ বিষয়ে আমি টেলিফোনে কিছু বলব না। কেননা, আপনাদের মধ্যে যেমন দায়িত্বশীল সাংবাদিক রয়েছেন, তেমনি আবার দায়িত্বজ্ঞানহীন সাংবাদিকও রয়েছেন। আমি বলি এক, আপনারা লেখেন আরেক। এ কারণে আমি টেলিফোনে কিছু বলব না। যা বলার সরাসরি বলব।’

সরাসরি বক্তব্য নেয়ার আগ্রহ জানানোর পর আগামী সপ্তাহের কোনো একদিন সময় দেয়ার আশ্বাস দেন মন্ত্রী।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/বি

Sharing is caring!