নিজস্ব প্রতিবেদক :

প্রথম দিনের চেয়ে লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার রাজধানীর সর্বত্রই আরও বেশি ঢিলেঢালাভাব দেখা গেছে। সব সড়কেই যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। অনেক স্থানে যানজট হয়েছে। সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও প্রথম দিনের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। প্রজ্ঞাপনের জায়গাতেই সীমাবদ্ধ ছিল সরকারি প্রজ্ঞাপন। সরকারের জারি করা বিধি নিষেধ মানার কোনো প্রবণতাই কারো মধ্যে দেখা যায়নি।

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে সড়ক, বাজার, পাড়া-মহল্লা, অফিসপাড়ায় স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করেই লোকজন চলাচল করছে। কাঁচাবাজারে গুলোর অবস্থা একেবারেই স্বাভাবিক ছিলো। পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা না থাকার কারণে বাজারে পণ্যের সরবরাহ একেবারেই স্বাভাবিক ছিল। ফলে ক্রেতাদের সমাগম অনেক বেশি ছিল। রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলো লকডাউন চলাকালে খোলা জায়গায় স্থানান্তরে সরকারের নির্দেশনা একেবারেই কাজে আসেনি। কাঁচা বাজারগুলো যেভাবে ছিল সেভাবেই চলেছে।

রাজধানীতে ২ সিটি কর্পোরেশনের ২৮টি কাঁচা বাজার রয়েছে। এই কাচার বাজারগুলোতেও লকডাউনের ছিটেফোঁটাও পড়েনি। স্বাস্থ্যবিধি চরমভাবে উপেক্ষা করে লোকজনকে চলাচল করতে দেখা গেছে। মোহাম্মদপুরের সাদেক খান কৃষি মার্কেট, আদাবর এলাকার কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার, কাওরান বাজার এলাকায় স্বাভাবিক সময়ের মতোই বেচা কেনা হয়েছে। সব বাজারে পণ্য সরবরাহ একেবারেই স্বাভাবিক ছিল।

গণপরিবহন না চললেও ব্যক্তিগত গাড়ি ও অফিসগামীদের জটলা ঠিকই ছিল রাস্তায়।

টাউন হল বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আমানুল্লাহ জানান, সকাল থেকেই তারা অন্যান্য দিনের মতো স্বাভাবিকভাবেই বেচাকেনা করছেন। লকডাউন চললেও ক্রেতাদের ভিড় রয়েছে। ব্যবসায়ীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেচাকেনা করছেন। তবে ক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে সচেতনতা নেই। বেশিরভাগ মানুষই গরমের কারণে মাক্স না পড়ে বাজার করছে। ফার্মগেট এলাকায় গার্মেন্টস আইটেমের বেশ কয়েকটি দোকানে কেনাবেচা করতেও দেখা গেছে।

নগরীর সব সড়কেই লকডাউনের প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিনে সব ধরনের যানবাহনের সংখ্যা আরও বেড়েছে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আনা নেয়ার জন্য নির্ধারিত বাস মিনিবাস ছাড়া সাধারণ মানুষ পরিবহনে কোনো গণপরিবহন চলাচল করেনি। তবে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পিকআপ ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি স্বাভাবিক সময়ের মতোই চলাচল করছে। এলিফেন্ট রোড সিগন্যাল, বাটা সিগনাল, নীলক্ষেত মোড়, কাওরান বাজার, ফকিরাপুল, রাজার বাগ সিগনালে ব্যাপক যানজট হয়েছে।

রাজধানীর বেশ কয়েকটি পয়েন্টে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণে চেকপোস্ট বসায় পুলিশ।

প্রথম দিন সড়কগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের তেমন একটা উপস্থিতি না থাকলেও আজ যানবাহনের চাপ সামলাতে বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। প্রতিটি সিগনালে স্বাভাবিক সময়ের মতো ৫ থেকে ৭ মিনিট পর্যন্ত সব যানবাহনকে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। কাকরাইল, পান্থপথ, ফকিরাপুল, শাহবাগ এলাকায় ট্রাফিক পুলিশকে তৎপর থাকতে হয়েছে। সাধারণ মানুষের চাপ একেবারেই স্বাভাবিক ছিল। গণপরিবহন না থাকায় অফিসগামী লোকজনকে আজও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অফিসগামী লোকজনকে রিকশা ও শেয়ারের সিএনজির জন্য বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে। তখন এর প্রথম দিনে রাজধানীতে রাইড শেয়ারের মোটরসাইকেল চালকদের সংখ্যা কম দেখা গেলেও মঙ্গলবার ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। অ্যাপস বন্ধ থাকায় এসব রাইড শেয়ারের মোটরসাইকেল চালকরা চুক্তিভিত্তিক ভাড়ায় চলাচল করেছে। তবে সব যানবাহন চালকরা মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ায় অনেকেই পায়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আয়েশা আক্তার ধানমন্ডি ২৭ নম্বর থেকে বনানী অফিসে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এই পথে সরাসরি কোনো রিকশা যেতে চায়নি। তিনি সিএনজিতে ওঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ার কারণে তিনি পায়ে হেঁটে ফার্মগেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

সাখাওয়াত হোসেন নামের অপর এক যাত্রী বলেন, যানবাহন না পাওয়ার কারণে প্রথম দিন অফিসে পৌঁছে সাড়ে এগারোটায়। আজ পায়ে হেঁটে যেতে আরও অনেক বেশি সময় লাগবে।

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মহাখালীর অফিসে যাওয়ার জন্য প্রায় এক ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছিলেন সুমনা বেগম। তিনি বলেন, অফিস খোলা রেখে গণপরিবহন বন্ধ করে সরকার ভাল কাজ করেনি। এভাবে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলার কোনো মানে হয় না। অফিসে না গেলে চাকরি চলে যেতে পারে। চাকরি গেলে পরিবার নিয়ে বিপদে পড়ে যাবেন। এ কারণেই তাকে অফিসে যেতে হবে।
শিল্প-কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানের নিজ উদ্যোগে আনা নেয়ার ব্যাপারে প্রজ্ঞাপনে শর্ত আরোপ করা হলেও রাজধানী ও আশপাশের শিল্প এলাকাগুলোতে এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। সকালের দিকে তেজগাঁও, মহাখালী, বনানী, এলিফেন্ট রোড এলাকার গার্মেন্টস কর্মীদের নিজ উদ্যোগেই যেতে দেখা গেছে।

যাত্রাবাড়ী-সাইনবোর্ড এলাকায় যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছেন সিএনজি চালকরা।

গার্মেন্টস কর্মী শাহানারা বেগম জানান, তাদেরকে নিজ উদ্যোগেই অফিসে যেতে বলা হয়েছে। অন্য সময় তারা বাস-মিনিবাস এ অফিসে যাতায়াত করতেন। কিন্তু এখন বাস না থাকায় পায়ে হেঁটে গার্মেন্টসে যেতে হচ্ছে। রিকশা ও সিএনজিতে আসা সম্ভব না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে উত্তরা, টঙ্গী, আশুলিয়া ও সাভার এলাকার গার্মেন্টস অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিজস্ব উদ্যোগে তারা যাতায়াত করছেন। প্রতিষ্ঠান তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এসব এলাকাতেও শ্রমিকদের পায়ে হেঁটে নিজ উদ্যোগে কর্মক্ষেত্রে যেতে দেখা গেছে।

লকডাউন চললেও রাজধানীর বাইরের মহাসড়কগুলোতে ব্যাপকহারে যানবাহন চলাচল করছে। যানবাহনের চাপের কারণে পাটুরিয়া দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। রাতে ফেরি চলাচল করলেও হঠাৎ করেই মঙ্গলবার সকাল দশটার দিকে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ ফেরি চলাচল একযোগে বন্ধ করে দেয়। এর ফলে কয়েকশ যানবাহন আটকা পড়ে। এই নৌরুটে প্রতিদিন ২০টি ফেরি চলাচল করে। ফের এগুলো বন্ধ হওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক পণ্যবাহী ট্রাক কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপ ভ্যান আটকা পড়েছে। ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় দৌলোদিয়া ফেরিঘাট একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/বি

Sharing is caring!