মোহাম্মদ সোহেল, নোয়াখালী :
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রশিক্ষণ প্রকল্পের আনুষঙ্গিক মালামাল কেনা ও ভুয়া প্রশিক্ষণার্থীর নামে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সেলাই, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ, পশু পালনসহ নানা ধরনের প্রশিক্ষণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এই প্রশিক্ষণ পরিচালনায় চিফ কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্বে রয়েছেন স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) প্রকল্প পরিচালক শংকর কুমার পাল। তার বিরুদ্ধেই অনিয়মের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে।

বিআরডিবি নোয়াখালী কার্যালয় থেকে জানা গেছে, রোহিঙ্গা প্রশিক্ষণের এই প্রকল্পের আওতায় প্রতি ব্যাচে ২৫০ জন রোহিঙ্গা অংশ নেন। ৫০ জনকে নিয়ে একটি গ্রুপ করে পাঁচটি গ্রুপের সমন্বয়ে পাঁচটি কক্ষে পাঁচ দিন ধরে ২৫০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এ পর্যন্ত চারটি ব্যাচে ১ হাজার রোহিঙ্গা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

প্রশিক্ষণে প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে প্রথম দিন গত রোববার ৩০০ টাকা মূল্যের একটি ব্যাগ, ১০ টাকার একটি কলম ও ৪০ টাকার একটি খাতা দেয়ার কথা ছিল।

অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে ৭০ টাকা মূল্যের ব্যাগ, ৩ টাকার কলম ও ১০ টাকা মূল্যের খাতা দেয়া হয়েছে। প্রতি ব্যাচে প্রথম দিন প্রশিক্ষণ সামগ্রী পাওয়ার আশায় ২৫০ জন প্রশিক্ষণার্থী উপস্থিত হন। তবে পরদিন তাদের সংখ্যা কমে যায়, আসেন ১০০ থেকে ১২০ জন।

গত মঙ্গলবার চলমান প্রশিক্ষণে ২৫০ জন প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে মাত্র ৮০ জন ও পরদিন বুধবার ৯০ জন উপস্থিত ছিলেন। তবে আয়োজকরা কৌশলে প্রথম দিনই প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে পাঁচ দিনের উপস্থিতির ঘরে স্বাক্ষর নেন।

শেষ চার দিন উপস্থিতি অর্ধেক বা তার চেয়ে কম হলেও ২৫০ জনকেই উপস্থিত দেখিয়ে সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার ও বিকেলের টিফিনের জন্য ভাউচার করা হয় জনপ্রতি ৩৬০ টাকা। অথচ স্থানীয় ফ্রেন্ডশিপ-২ হোটেল থেকে জনপ্রতি মাত্র ১২০ টাকায় দুপুরের খাবার কেনা হয়। সকাল-বিকেলের নাশতার জন্য খরচ করা হয় ৫০ থেকে ৭০ টাকা।

এভাবে প্রশিক্ষণার্থীর প্রতি ব্যাচের খাবার থেকে প্রায় ২ লাখ টাকা করে চারটি ব্যাচে ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ।

ফ্রেন্ডশিপ-২ হোটেলের পরিচালক কামরুল ইসলাম জানান, দুপুরের খাবারের জন্য (মাছ-ভাত-ডাল-ভর্তা) প্রতিজনের বিল করা হয় ১২০ টাকা। এ ছাড়া দুই বেলার নাশতার বিল রয়েছে। নাশতা একেক দিন একেক রকমের অর্ডার দেয়া হয়।

এ প্রকল্পে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ২০ জনকে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে ছয় মাসের জন্য নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রশিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। স্থানীয় প্রশিক্ষকের অনেকে প্রাপ্য ভাতা থেকে প্রকল্প পরিচালককে কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় প্রথম ব্যাচ শেষে তাদের বাদ দিয়ে কমিশন দেয়ার মৌখিক চুক্তিতে অধিকাংশ প্রশিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে।

প্রতি ক্লাসের জন্য তাদের জনপ্রতি ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। জেলার বাইরে থেকে নিয়োগ দেয়া এসব প্রশিক্ষকের যাতায়াত বিল ধরা হচ্ছে ‘প্রচুর’। তা ছাড়া ২০ জন প্রশিক্ষকের জন্য ২০টি কম্বল কেনা হয়েছে ৮০০-৯০০ টাকা দরে। অথচ এসব কম্বলের মূল্য ধরা হয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকা।

স্পট কোটেশনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের যাবতীয় মালামাল কেনার নিয়ম থাকলেও সব মালামাল সরবরাহ করেছেন প্রকল্প পরিচালক শংকর কুমার পাল নিজেই।

বিআরডিবি নোয়াখালীর উপপরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি এখানে (ভাসানচর) এসেছি প্রশিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিতে। প্রশিক্ষণার্থীর উপস্থিতি ও আর্থিক বিষয়ের সঙ্গে আমি সরাসরি জড়িত নই। ঢাকা হেড অফিস থেকে প্রকল্প পরিচালক শংকর বাবু সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। আপনি ওনার সাথে যোগাযোগ করুন।’

হাতিয়া পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তাও প্রায় একই কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘ভাসানচর খুবই দুর্গম এলাকা, আসা-যাওয়া ব্যয়বহুল। তাই একটু এদিক-সেদিক করে পুষিয়ে নেয়া হচ্ছে।’
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকল্পের চিফ কো-অর্ডিনেটর শংকর কুমার পাল।

তিনি বলেন, ‘আপনাকে এসব কে বলেছে? তার নামটি জানতে পারি? প্রকল্পটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় আরডিও (উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা) ও এআরডিও (সহকারী উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা)। তাদের স্বাক্ষরে সব কাজ হচ্ছে। আপনি তাদের কাছ থেকে প্রকল্প বিষয়ে খবর নেন। আমি এসব অনিয়মের কিছুই জানি না।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রথম দফায় ১ হাজার রোহিঙ্গার প্রশিক্ষণের জন্য ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। বৃহস্পতিবার তা শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় আরও ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। রোববার এই প্রশিক্ষণ শুরু হবে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে প্রত্যেক রোহিঙ্গা পরিবারকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।’

বরাদ্দের এ তথ্য খতিয়ে দেখতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে এ প্রশিক্ষণ প্রকল্পের চিফ কো-অর্ডিনেটর শংকর কুমার পালের সঙ্গে পুনরায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

হাতিয়া পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা (আরডিও) মো. শরীফ বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন বসের চাপে আছি। উনি যখন যা চাচ্ছেন, আমি তাই করতে বাধ্য হচ্ছি। এ ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না। এ বিষয়ে জানতে হলে আপনি পিডির (প্রকল্প পরিচালক) সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

এদিকে এ প্রকল্পের এক প্রশিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। রংপুরের উপজেলা বিআরডিবি কর্মকর্তা লিটন মোহন দে এখানে প্রশিক্ষক হিসেবে এসেছিলেন। প্রশিক্ষণের ফাঁকে প্রশিক্ষণ সহায়ক বিআরডিবির এক নারী মাঠকর্মীকে তিনি ধর্ষণের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই নারী বিষয়টি তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যুগ্ম পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালককে জানান। প্রকল্প পরিচালক এ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে মীমাংসায় যাওয়ার কথা বলেন।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে লিটনকে প্রশিক্ষক থেকে অব্যাহতি দিয়ে রংপুর পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আর ওই নারী মাঠকর্মীকে ভাসানচর থেকে প্রত্যাহার করে তার আগের কর্মস্থলে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।’

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/বি

Sharing is caring!