বিনোদন ডেস্ক :

১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন গিটার জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু। ইশহাক-নুরজাহান দম্পতির তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম শহরের জুবিলী রোডে একটি কিনেন তার বাবা ইশহাক চৌধুরী। যেখানে তার কৈশর জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটে।

কৈশর জীবনের শুরুর দিকে ব্রিটিশ ও আমেরিকান রক ব্যান্ডের গানের ভক্ত ছিলেন বাচ্চু। ১৯৭৩ সালে ১১তম জন্মদিনে তার বাবা তাকে একটি গিটার উপহার দেন। তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রামে থাকা জেকব ডায়াজ নামে এক বার্মিজ নাগরিকের কাছে গিটার শিখতেন তিনি।

চট্টগ্রামের সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি হয় বাচ্চুর। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাশ করেন। ১৯৭৬ সালে কলেজ জীবনে সহপাঠীদের নিয়ে গড়ে তোলেন একটি ব্যান্ডদল। যার নাম রাখেন ‘গোল্ডেন বয়েজ’। পরে সেটির নাম পরিবর্তন করে দেয়া হয় ‘আগলি বয়েজ’। ব্যান্ড দলটির গায়ক ছিলেন কুমার বিশ্বজিৎ এবং বাচ্চু ছিলেন গিটারিস্ট। সেসময় তারা গ্রামের বিভিন্ন বিয়ের অনুষ্ঠানে ও শহরের বিভিন্ন ক্লাবে গান গাইতেন।

নিজ ব্যান্ড দলের পাশাপাশি ১৯৭৭ সালে ‘ফিলিংস’ নামে একটি রক ব্যান্ডদলে গিটারবাদক হিসেবে যোগ দেন বাচ্চু। যা বর্তমানে ‘নগর বাউল’ নামে পরিচিত। সেখানে শহীদ মাহমুদ জঙ্গির ‘হারানো বিকেলের গল্প’ গানে প্রথম কণ্ঠ দেন তিনি। সেই ব্যান্ড দলটির সঙ্গে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত কাজ করে একই বছর গিটারবাদক হিসেবে যোগ দেন ‘সোলস’-এ। সেখানে টানা ১০ বছর লিডগিটার বাজানোর দায়িত্বে ছিলেন।

১৯৮৬ সালে তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্তগোলাপ’ এবং ১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘ময়না’ প্রকাশিত হয়।

এছাড়া ‘সোলস’ এর সঙ্গে থেকে ১৯৮২ সালে সুপার সোলস, ১৯৮৫ সালে কলেজের করিডোরে, ১৯৮৭ সালের মানুষ মাটির কাছাকাছি ও ১৯৮৮ সালে ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট নামে চারটি অ্যালবামে কাজ করেন তিনি। পরে ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ‘সোলস’ থেকে বিদায় নেন।

১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল নিজেই গঠন করেন ‘ইয়েলো রিভার ব্যান্ড’ নামে একটি ব্যান্ডদল। যা বর্তমানে এলআরবি নামে পরিচিত। ব্যান্ড দলটি গঠনের কয়েকদিন পরই একটি অনুষ্ঠানে গান করতে বিদেশ পাড়ি জমান বাচ্চু। সেখানে অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তরা ভুল করে তার ব্যান্ড দলের নাম লিখেন ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’। কিন্তু সেই ভুল নামটিই পছন্দ হয় বাচ্চুর। তাই এরপর থেকে ব্যান্ড দলটির নাম রাখেন ‘এলআরবি’।

নামটি তখন বেশ জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু হঠাৎ জানা গেল- একই নামে আরেকটি ব্যান্ডদল রয়েছে অস্ট্রেলিয়াতে। তবে এবার আর নাম পরিবর্তন করলেন না তিনি। সংক্ষিপ্ত নাম ‘এলআরবি’ ঠিক রেখে ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’ এর পরিবর্তে নাম রাখেন ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’। এরপর থেকেই সূচনা হয় ইতিহাস সৃষ্টির। তার হাত ধরে মুক্তি পায় দেশের প্রথম দ্বৈত অ্যালবাম ‘এলআরবি-১’ ও ‘এলআরবি-২’। মৃত্যু অবধি ২৭ বছর ধরে ব্যান্ডদল ‘এলআরবি’র সঙ্গে ছিলেন তিনি।

তার ব্যান্ড অ্যালবামগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘এলআরবি’, ‘সুখ’, ‘স্বপ্ন’, ‘মন চাইলে মন পাবে’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘তবুও’, ‘মনে আছে নাকি নেই’, ‘অচেনা জীবন’, ‘ফেরারী মন’, ‘আমাদের বিস্ময়’, ‘যুদ্ধ’ এবং ‘স্পর্শ’।

এছাড়া একক অ্যালবামের মধ্যে ‘রক্তগোলাপ’, ‘দুটি মন’, ‘বলিনি কখনো’, ‘প্রেম প্রেমের মতো’, ‘কষ্ট’, ‘সময়’, ‘প্রেম তুমি কি’, ‘একা’, ‘ময়না’, ‘ভাটির টানে মাটির গানে’, ‘কাফেলা’, ‘পথের গান’, ‘জীবনের গল্প’ ও ‘জীবন’ উল্লেখযোগ্য।

১৯৯১ সালের ৩১ জানুয়ারি তিনি ফেরদৌস চন্দনার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ঘরে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে।

২০১২ সালের ২৭ নভেম্বর ফুসফুসে পানি জমে অসুস্থ হয়ে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন বাচ্চু। সেখানে চিকিৎসা গ্রহণের পর তিনি সুস্থ হন। পরে ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাকে চট্টগ্রাম নগরীর চৈতন্য গলি এলাকায় নিজেদের পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।

আইয়ুব বাচ্চুকে শ্রদ্ধা জানাতে চট্টগ্রাম নগরীর প্রবর্তক মোড়ে স্থাপিত হয়েছে ১৮ ফুট উচ্চতার একটি গিটারের ভাস্কর্য। তার একটি জনপ্রিয় গানের শিরোনাম অনুসারে ভাস্কর্যটির নাম রাখা হয়েছে ‘রূপালী গিটার’। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম  নাছির উদ্দিন ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করেন।

  • সংবাদ সংলাপ/এসইউ/রা

Sharing is caring!