নিউজ ডেস্ক :

দেশের বোরো ধানের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার কৃষকদের মাথায় হাত। হঠাৎ অচেনা এক দুর্যোগ ‘গরম বাতাসে’ এসে এলোমেলো করে দিয়েছে সব। পুড়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। একই দশা গোপালগঞ্জেরও কয়েকটি উপজেলায়।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গরম বাতাসে তিন জেলায় অন্তত ৪২ হাজার হেক্টর বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এর সঠিক কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না কৃষিবিজ্ঞানীরা। কৃষকদের স্বপ্ন তছনছ করে দেয়া এই দুর্যোগকে কৃষিবিদদের কেউ বলছেন ‘হিট শক’, কেউ বলছেন ‘লু হাওয়া’। আর আবহাওয়াবিদদের দাবি, বাংলাদেশে এখন যে তাপমাত্রা তাতে লু হাওয়া বয়ে যাওয়ার মতো কোনো অবস্থা নেই।

নেত্রকোণা

জেলাটিতে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা।

চলতি বোরো মৌসুমে নেত্রকোণার ১০ উপজেলায় ১ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। আবহাওয়া পরিস্থিতি এত দিন চমৎকার থাকলেও রোববার হানা দেয় অচেনা বিপত্তি।

সেদিন সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ কালবৈশাখির দমকা বাতাস বয়ে যায় জেলার ওপর দিয়ে। এই বাতাস শুরুর কিছু সময় পর বইছিল গরম বাতাস। এই প্রথম তখন ১০ থেকে ১৫ মিনিট নাগাদ বয়ে যাওয়া গরম বাতাসে ফুল অবস্থায় থাকা জমির পুরোটাই শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।

জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই কমবেশি ক্ষতি হয়েছে। তবে মদন, খালিয়াজুরী ও কেন্দুয়া উপজেলায় বেশি ক্ষতি হয়েছে।

মদনে ৪ হাজার হেক্টর, কেন্দুয়ায় ২ হাজার ৭০০ হেক্টর ও খালিয়াজুরী উপজেলায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ফসল পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, প্রাথমিকভাবে ১৪ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১১৬ কোটির বেশি টাকা।

ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কয়েকজন কৃষক জানান, তারা ঋণ করে ফসল করছেন। হাওরাঞ্চলে একটাই ফসল হয়। এখন ঋণ পরিশোধ হবে কীভাবে, আর কীভাবে সংসার চলবে, সেটি বুঝে উঠতে পারছেন না তারা।

মদন উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আব্দুর রহমান বলেন, ‘জীবনে এইরম গরম বাতাস দেখছি না। অক্করে আগুনের লুক্কার মতো গরম। ঝড় কইম্যা গেলে ঘরতে বাইর অয়া দেহি পুড়ার গন্ধ। পয়লা বুঝতে পারছি না। বেইন অক্ত (সকালে) হাওরে গেয়া দেহি, ধানের ভিতরে যে চাউল অয় হেইডা অক্করে ঝইরা পুইড়া গেছে।’

কেন্দুয়া উপজেলা রোয়াইলবাড়ি ইউনিয়নের কইলাটি গ্রামের কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, ‘রাইতে যে হাওয়াডা অইছে এইডায় জমি পুইরা গেছেগা। আমার ২৫ কাঠা জমির ধান শেষ অইয়া গেছে।’

খালিয়াজুরী উপজেলার আদমপুর বোয়ালবাড়ি গ্রামের কৃষক বাবলু চৌধুরী এবার ৮ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। তার অর্ধেক জমির ফসলই নষ্ট হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘ভাটি অঞ্চলে একডাই ফসিল অয়। ঋণ ফিন কইরা বোরো করছিলাম। সব গেছেগা। অহন আমরা কী খাইয়া বাঁচব।’

মোহনগঞ্জ উপজেলার বানিহারি গ্রামের কৃষক আইন উদ্দিন বলেন, ‘কী কষ্ট কইরা রেনাদেনা কইরা একডাই ফসিল করলাম। সব নষ্ট অইয়া গেছে। কিবায় চলাম?’

কিশোরগঞ্জ

গরম বাতাসের প্রভাবে গত রোববার কিশোরগঞ্জে হাজার হাজার একর জমির বোরো ধান পুড়ে গেছে।

জেলার ১৩টি উপজেলার হাওরে মাত্র ১০ মিনিটের গরম বাতাসে প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমির ধান পুড়ে গেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২০০ কোটি টাকার মতো।

জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, বোরো ধানের জমি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ৩ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমির। আর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২২ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমির ধান।

কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার রায়টুটী ইউনিয়নের কৃষক পালন মিয়া। এই চাষি ধান আবাদ করেছিলেন ছয় একর জমিতে। আশা করছিলেন ধান পাবেন কমছে কম চার শ মণ। কিন্তু সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। মাত্র ১০ মিনিটের গরম বাতাসে নষ্ট হয়েছে কৃষক পালন মিয়ার জমির ফসল।

রায়টুটী এলাকার তলার হাওরে ১২ একর জমি আবাদ করেছিলেন কৃষক আ. হেকিম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গত বছর ধানের দাম বেশি ফাইছি, হের লাইগ্যা এইবার আরও বেশি কইরে জমি করছি। জমির মইধ্যে ফসলও অইছিন বালা। কিন্তু গত রাইতেই ১০ মিনিডের একটা গরম বাতাসে সব পুইড়ে ছারকার কইরে দিসে। আমার সত্তর বছর বয়সে এই যাইত্তে বাতাস আমি জীবনেও দেখছি না। সহালে ঘুমেত্তে উইট্টে জমিতে গিয়া দেহি সব শেষ।

কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি কৃষি বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছি। তালিকা হাতে পেলে সহায়তা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখিত পাঠানো হবে।’

গোপালগঞ্জের অনেক ধান মাঠেরও একই একই অবস্থা।

গোপালগঞ্জ

গরম বাতাসে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে গোপালগঞ্জের বোরোচাষিরাও। জেলা কৃষি বিভাগ ক্ষতির পরিমাণ এখনও সুনির্দিষ্ট করতে না পারলেও তাদের ধারণা অন্তত হাজার- বারো শ হেক্টর জমির ধান পুড়ে গেছে।

জেলার কৃষি বিভাগ বলছে, অন্তত ১০টি ইউনিয়নে এই হাওয়ার প্রভাব দেখা গেছে। হঠাৎ করে এ ধরনের ঘটনায় একদিকে যেমন কৃষকেরা হতবাক অন্যদিকে, এর জুতসই কারণ খুঁজে পাচ্ছে না কৃষি বিভাগ।

এর আগে এ ধরনের ঘটনা কোথাও ঘটেছে কি না কারও জানা নেই। যে কারণে গোপালগঞ্জ কৃষি অফিস থেকে বিষয়টির ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য ফরিদপুরের ভাঙ্গায় অবস্থিত ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের আহ্বান জানিয়েছে।

গত রোববার রাতে ৩০ মিনিটের মতো জেলার বিভিন্ন এলাকায় গরম বাতাস বয়ে যায়। আর এতে ক্ষেতে উঠতি বোরো ধান যেগুলেতে কেবল ধানের শিষ (দুধ) এসেছে সেই ধান সব চিটায় পরিণত হয়ে সাদা বর্ণ ধারণ করে। আর এতে জেলার শত শত কৃষক কয়েক কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি, পিঞ্জুরী, হিরণ ও আমতলী ইউনিয়ন, টুঙ্গিপাড়া উপজেলার গোপালপুর, ডুমুরিয়া, পাটগাতি ও বর্নি ইউনিয়ন, কাশিয়ানীর রাতইল ইউনিয়ন, সদর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের শ শ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে।

কৃষকেরা আগামী বছর কী খেয়ে বাচঁবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। রোববার বিকেলেও কৃষকেরা তাদের ধান ক্ষেতে সবুজ দেখে আসলেও সকালে জমির আলে গিয়ে দেখেন সব ধান সাদা হয়ে গেছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি। কীভাবে কী হলো।

জেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, এ বছর গোপালগঞ্জ জেলায় ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এর এক দল বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার পুড়ে যাওয়া বিভিন্ন জমি পরিদর্শন করেন। এই দলে ছিলেন ইনস্টিটিউটের ড. মো. নজরুল বারী, মোহাম্মদ আসিক ইকবাল খান, ড. মো. সাজ্জাদুর রহমান।

কেন্দুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একেএম শাহজাহান কবীর জানান, বিজ্ঞানী দলের সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করেছেন। তারা উপজেলার তাম্বুলিপাড়া, গোগ এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে যান। সেখানে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরে ধানের ফুল ও দুধ অবস্থায় তাপ প্রবাহের দরুণ ‘হিট শক’ হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন দলের সদস্যরা ।

তিনি আরও জানান, এ অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে বারির পরিদর্শন টিমের সদস্যরা দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তাদের পরামর্শ, যেসব ধান এখনও শীষ বের হয়নি অর্থাৎ বুটিং ও হেডিং স্টেজ এ আছে, সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। তাই এই স্টেজে থাকা ধানের ক্ষেতগুলোতে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখা এবং ম্যাজিক স্প্রে (১০ লিটার পানিতে ৬০ গ্রাম এমওপি সার, ৬০ গ্রাম থিওভিট ও ২০ গ্রাম চিলেটেড জিংক) জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। এতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা ধানগাছগুলো কিছুটা শক কাটিয়ে উঠতে পারবে।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ছাইফুল আলম বলেন, ‘বৃষ্টিবিহীন ঝড়ো বাতাসে এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হাওরের ধানের গাছগুলো এখন মিল্কিং স্টেজে (দুধ অবস্থায়) আছে। এই সময়ে প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম বাতাসে ধান পুড়ে চিটা হয়ে গেছে।’

গরম বাতাস তথা ‘লু হাওয়ার’ কারণেই এসব ধান নষ্ট হয়েছে বলে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিদের বরাতে জানিয়েছেন গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. অরবিন্দ কুমার রায়।

তিনি বলেন, ‘জেলার টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া এবং কাশিয়ানীতে এক রাতের মধ্যে শত শত হেক্টর জমির ধান সবুজ থেকে সাদা হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে ধানের শিষ (দুধ অবস্থায়)। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন লু হাওয়া বা গরম বাতাসের কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।’

মঙ্গলবার ধান গবেষণা ইনিস্টিটিউটের ভাঙ্গা (ব্রি) এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. একলাচুর রহমান, বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মনোজিৎ কুমার মল্লিক, গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. অরবিন্দ কুমার রায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন।

তারা জানান, গরম বাতাসের কারণে যেসব ধান কেবল দুধ অবস্থায় বা ফ্লাওয়ারিং অবস্থায় রয়েছে সেসব ধানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা কৃষকদের ধান গাছে পানি দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাতে যেসব ধান ফ্লাওয়ারিং অবস্থায় রয়েছে সেগুলো বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/বি

 

Sharing is caring!