নোয়াখালী প্রতিনিধি :
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের (৬৪ জেলা) প্রোগ্রাম অফিসার (পিও) ও এনজিও প্রতিনিধির অনিয়মের কারণে এখনো সাক্ষরজ্ঞান থেকে বঞ্চিত রয়েছেন প্রকল্প এলাকার হাজার হাজার নিরক্ষর জনগোষ্ঠী।

সরেজমিন উপজেলার জাহাজমারা, তমরদ্দি, চর কিং, হরণী ও চানন্দি ইউনিয়ন ঘুরে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের নিরক্ষর জরিপ, সুপারভাইজার ও শিক্ষকদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, সামাজিক উদ্বদ্ধকরণ, শিক্ষা উপকরণ বিতরণসহ যাবতীয় কর্মকান্ডে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করে গেছেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফেইথ এন্ড হোপ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন এবং প্রকল্পের প্রোগ্রাম অফিসার। এতে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করার যে উদ্দেশ্য, সেটি ব্যাহত হয়েছে।

প্রকল্পের হরণী ইউনিয়নের সুপারভাইজার আজগর হোসেন ও শিক্ষক আকবর হোসেনসহ উপজেলার এপাড়-ওপাড়ের বেশ কয়েকজন সুপারভাইজার-শিক্ষক অভিযোগ করে জানান, প্রকল্পে প্রোগ্রাম অফিসার মো. মাইন উদ্দিন ও এনজিও প্রতিনিধি সহযোগে প্রকল্পের মূল্যায়ন শেষে মোটা অংকের অফিস খরচ দেখিয়ে সুপারভাইজারদের তিন মাসের বেতন বাবদ ভ্যাট, আয়কর ও রেভিনিউ স্ট্যাম্পের খরচ বাদ দিয়ে ২৩৮০ টাকার স্থলে ১৬০০ থেকে ২১০০ টাকা এবং শিক্ষকদের ৩০৯৪ টাকার স্থলে ১৭০০ থেকে ২২০০ টাকা প্রদান করেন। তাদের অভিযোগ, বেতন প্রদানের সময়কালে হাতিয়া বেশিরভাগ এলাকা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়ায় বহু শিক্ষককে বেতন না দিয়ে সুপারভাইজার শিক্ষকদের স্বাক্ষর সীটে নিজেই ভুয়া স্বাক্ষর করে লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।

সুপারভাইজার-শিক্ষকরা জানান, প্রকল্পের শুরুতে কেন্দ্র প্রতি ঘর ভাড়া দেওয়ার কথা থাকলেও মূল্যায়ন শেষে ওই ঘর ভাড়ার টাকা দেয়া হয়নি। প্রকল্পের শুরু থেকেই শিক্ষা উপকরণ বিতরণসহ যাবতীয় কর্মকান্ডে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। প্রকল্পের নানা অনিয়মে সঠিকভাবে বেতন ও উপকরণ না পেয়ে শিক্ষকরা পাঠদানের আগ্রহ হারিয়ে পেলেন। এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো সাক্ষরজ্ঞান থেকে বঞ্চিত রয়েছেন এলাকার মানুষ।

স্থানীয় উপকারভোগীরা জানান, প্রকল্পের শুরুতেই গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে পড়ালেখা করানো হবে বলে পুরুষ-মহিলাদের নাম তালিকা করা হয়। এরপর প্রথম প্রথম ওপরের স্যাররা আসলে মাঝে মধ্যে আপা-স্যাররা তাদের ডেকে ওই স্কুলে বসাতেন। তার পর ওইখানে পড়ালেখার আর কোন হদিস মেলেনি।
চর হরণী ইউনিয়নের শিখন কেন্দ্র-১৪ এর আওতাধীন নাজমা বেগম (৩৩) বলেন, তিনি নামদাম শেখার জন্য ওই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। কিছু দিন ওইখানে পড়ালেখা করেছেন। পরে কেন্দ্রে আর পড়ানো হতো না। মাঝে মধ্যে উপর থেকে কেউ আসলে তাদেরকে ডেকে উনাদের সামনে বসানো হতো। এতে তার নামদাম শেখার স্বপ্ন-স্বপ্নই থেকে গেল। একই কথা জানালেন শিখন কেন্দ্র-৬ আবদুল রশিদ, জমির উদ্দিনসহ একাধিক ব্যক্তি।

মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪ জেলা) হাতিয়ায় দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রোগ্রাম অফিসার মো. মাইন উদ্দিন শিক্ষক-সুপারভাইজারদের বেতন নিয়ে অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, প্রকল্পের মূল্যায়ন শেষে সুপারভাইজারগন প্রতি মাসে ৯০০ টাকা হারে ২৭০০ টাকা করে পাওনা হয়েছেন। রেভিনিউ স্টাম্প বাবদ ৩০ টাকা বাদ দিয়ে তাদেরকে ২৬৭০ টাকা করে প্রদান করা হয়েছে এবং শিক্ষকগন তিন মাসে ৩২৪০ টাকা পাওনা হয়েছেন। তাদেরকে রেভিনিউ স্টাম্প বাবদ ৯০ টাকা বাদ দিয়ে ৩১৫০ টাকা করে প্রদান করা হয়েছে। প্রত্যেক সুপারভাইজার ও শিক্ষকগন টাকা বুঝে নেওয়ার স্বাক্ষর দিয়েছেন। প্রকল্পের অন্যান্য অনিয়মের বিষয়ে তিনি জানান, তখন তিনি এই উপজেলায় ছিলেন না।

হাতিয়া উপজেলায় নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরজ্ঞান করতে ১৮ হাজার নিরক্ষর নারী-পুরুষ চিহ্নিত করে ১৫ জন সুপারভাইজার ও ৬শ জন (নারী-পুরুষ) শিক্ষককের মাধ্যমে দুই শিফটে ৬শ কেন্দ্র চালু করা হয়। কিন্তু প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওই উপজেলায় এখনো হাজার হাজার মানুষ সাক্ষরজ্ঞান থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বলে সরেজমিনে অভিযোগ উঠে আসে।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/রা

Sharing is caring!