নোয়াখালী প্রতিনিধি :
নোয়াখালীর হাতিয়ায় ভিডিও ভাইরালে অনৈতিক কাজের অপবাদে গৃহবধূসহ দুইজনকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এ ঘটনায় ওই গৃহবধূ পাঁচজনকে আসামী করে আদালতে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করে। তবে পুলিশের দাবী, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে দেখা যায় একজন পুরুষকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করা হচ্ছে, কোন নারীকে নয়।
এদিকে পল্লী চিকিৎসক মহি উদ্দিন বাদী হয়ে ১১ জনকে আসামী করে রোববার রাতে হাতিয়া থানায় একটি মামলা করে। মামলার বাদী মহি উদ্দিন (৪০) হাতিয়ার ২নং চানন্দী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড়ের আদর্শ গ্রামের মো: আবুল খায়েরের ছেলে। এই মামলায় ৫জনকে আটক করেছে বলে সোমবার দুপুরে নোয়াখালী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। আটককৃত ৫জন হলো জিয়া বাহিনী প্রকাশ জিহাদ(৩০), ফারুক হোসেন(৩০), আলমগীর মাঝি(৪০), আবু তাহের (৩২)ও নবীর উদ্দিন (৩২)। এদের সবার বাড়ী হাতিয়ার চানন্দী ইউনিয়নে।
হাতিয়া উপজেলার চানন্দি ইউনিয়নের আদর্শগ্রামে নিজ ঘরে এক গৃহবধূকে ধষণের চেষ্টা করা হয়। পরে ব্যর্থ হয়ে ওই গৃহবধূকে তার সন্তানদের সামনে বেদম মারধর করে স্থানীয় জিহাদ, ফারুক, এনায়েত, ভুট্টু মাঝি ও ফারুক। এমন অভিযোগ এনে ওই পাঁচজনকে আসামী করে গত ৫ জানুয়ারী জেলার নারী-শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল- ২ এ ধর্ষণ চেষ্টার একটি মামলা করে ওই গৃহবধূ। তবে মামলায় ঘটনাস্থল গৃহবধূর ঘর দেখানো হলেও গণমাধ্যম কর্মীদেরকে ভোক্তভোগী নারী জানান, তাকে স্থানীয় এক পল্লী চিকিৎসকের বাড়ির সামনে নির্যাতন করা হয়।
এদিকে এ ঘটনার মোবাইলে ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যাক্তি একজন লোককে নির্যাতন করে টেনে হেঁচড়ে একটি কক্ষে ডুকিয়ে ফেলে এবং দরজা বন্ধ করে দেয়। অপর একজন লাঠি দিয়ে ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করছে। এ সময় নারীর চিৎকারের কণ্ঠ শোনা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি নারীর বলে লেখা হয়। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আসলে রোববার সন্ধ্যায় হাতিয়ার চানন্দী ইউনিয়নে যান নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মো: আলমগীর হোসেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিডিওটিতে দেখা যায় একজন পুরুষকে নির্যাতন করছে কয়েকজন ব্যক্তি, কোনো নারীর নয়। তবে ভিডিওতে একজন নারীর চিৎকারের আওয়াজ শুনা যাচ্ছে।
নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদী থেকে অন্তত ৬০ কিলোমিটার দুরে এবং হাতিয়ার উপজেলা সদর থেকে নদী পার হয়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দুরে ২নং চানন্দী ইউনিয়নের এই আদর্শ গ্রাম। ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে নারীকে নির্যাতনের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এর যোগসূত্র জানতে ঘটনাস্থলে যায় গণমাধ্যমকর্মীরা। কথা হয় নির্যাতিতা নারী, ভিডিওতে দেখা যাওয়া ওই পুরুষ এবং স্থানীয়দের সাথে। নানা রকমের বক্তব্য আসলেও ভিডিও এর সঙ্গে একটা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় অনুসন্ধানে।
স্থানীয়দের মতে, ওই গৃহবধূ এবং স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের মধ্যে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। তারই জের ধরে গত ১ জানুয়ারি তাদের দুজনকে এক সঙ্গে পেয়ে মারধর করে স্থানীয় কিছু লোক। পরে দুইজনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে পুলিশে খবর দেয়া হয়। কথা হয় ২নং চানন্দী ইউনিয়নের আদর্শ গ্রামের নুরুল ইসলাম হাজী নামে এক বয়স্ক লোকের সাথে। তিনি জানান, এই মহিলার সাথে পল্লী চিকিৎসক মহি উদ্দিনের দীর্ঘদিন থেকে অনৈতিক সম্পর্ক চলে আসছে। এরআগেও তাদের অবৈধ কর্মকান্ডের বিষয়ে সামাজিকভাবে শালিশ বৈঠক হয়।
গৃহবধূ ও পল্লী চিকিৎসককে মারধরের খবর পেয়ে পুলিশ দুজনকে উদ্ধার করে গৃহবধূকে চিকিৎসার জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠান। পরে ওই গৃহবধূ চিকিৎসা শেষে ৫ জানুয়ারি আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্ত করে সাত কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন হাতিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার গোলাম ফারুককে।
হাতিয়া সার্কেলের সহাকরী পুলিশ সুপার গোলাম ফারুক জানান, আদালতের নির্দেশনা হাতে পাওয়ার পর গত শনিবার তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী দুই তিন দিনের মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
সোমবার দুপুরে নোয়াখালী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন জানান, এলাকার কিছু উৎশৃঙ্খল বখাটে যুবক অনৈতিক কাজের অপবাদ দিয়ে পল্লী চিকিৎসক ও একজন গৃহবধূকে মারধর করে গাছের সাথে বেঁধে রাখে। পুরুষ নির্যাতনের ঘটনাটি তারা মোবাইলে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়। বিষয়টি পুলিশের নজরে আসলে রোববার তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঘটনায় নির্যাতনের শিকার পল্লী চিকিৎসক বাদী ১১জনকে আসামী করে হাতিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করলে রাতেই অভিযান চালিয়ে পাঁচ আসামীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সোমবার দুপুরে তাদের আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/বি

Sharing is caring!