অর্থনীতি ডেস্ক:

‘হুন্ডি’ একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন পত্র যা মোগল অর্থনীতির অধীনে বিকশিত হয়। ‘হুন্ডি’ হচ্ছে আর্থিক দলিলসমূহ যার অর্থ পাঠানো, ঋণ প্রদান ও বাণিজ্যিক লেনদেন বিনিময় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ‘হুন্ডি’কে কৌশলগতভাবে একটি লিখিত শর্তহীন আদেশ বলা হয় যা ব্যক্তির নির্দেশনায় লিপিবদ্ধ করা পত্র বা নির্দেশনামায় নাম উল্লিখিত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হয়। তবে এখন এটি নীতি বহির্ভূত ও দেশের আইন দ্বারা নিষিদ্ধ অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ হস্তান্তর বা স্থানান্তর ব্যবস্থা। সুতরাং ‘হুন্ডি’র কারণে দেশ-বিদেশে নানা ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি ‘হুন্ডি’র কারণে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে।  আজ ‘হুন্ডি’ সম্পর্কে বিস্তারিত জানব আমরা।

‘হুন্ডি’ আসলে কী?

‘হুন্ডি’কে Bill of Exchange বা বিনিময় বিল বলা হয়। ‘হুন্ডি’ (Hundi) শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘হুন্ড’ (Hund) থেকে উদ্ভব হয়েছে যার অর্থ হলো ‘সংগ্রহ করা’। এটি বাণিজ্যিক বা ঋণ সংশ্লিষ্ট লেনদেনের লিখিত ও শর্তহীন দলিল। এ দলিলের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে নির্দেশিত পরিমাণ টাকা লেনদেন হয়। অর্থাৎ পৃথক স্থানে থাকা দুই ব্যক্তির সম্মিলনে একটি দলিল বা নির্দেশনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি থেকে নেয়া অর্থ নির্দেশিত স্বজন বা কাউকে প্রদান করাকে ‘হুন্ডি’ বলা হয়।

যেমন, রাহাত আলী ও ফাতেহ আলী দুই ভাই। রাহাত যুক্তরাজ্যে থাকেন, আর ফাতেহ শ্রীলঙ্কায় থাকেন। যুক্তরাজ্যে থাকা প্রবাসী জামিল দেশে থাকা ভাই কামিলকে বাংলাদেশি টাকার হিসাবে দুই লাখ টাকা পাঠাবেন। কিন্তু যুক্তরাজ্যের ব্যাংক, শ্রীলঙ্কার ব্যাংকসহ নানা ফিসহ দেশে পৌঁছাতে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। বিষয়টি রাহাত আলী জানতে পেরে জামিলকে প্রস্তাব দিলেন যে, আপনি যদি আমাকে দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকা দেন তাহলে দুই লাখ টাকা আপনার ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। প্রবাসী জামিল ১৫ হাজার টাকা ব্যয় কম পেয়ে রাহাত ও তার ভাই ফাতেহের মাধ্যমে কামিলকে দুই লাখ টাকা পৌঁছে দেয়া হয়। মূলত দুই ভাইয়ের সম্মিলিত চুক্তি অনুযায়ী অলিখিতভাবে জামিল ও কামিলের মধ্যে টাকা আদান-প্রদান হয়। ফলে দুই দেশের কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান টাকা স্থানান্তরের বিষয়টি অবগত থাকে না।

হুন্ডিকে নানাভাবে নানাজন সজ্ঞায়িত করেছেন। Merriam Webster এ বলা হয়েছে- A negotiable instrument, bill of exchange, or promissory note of India used especially in the internal finance of trade.

অর্থাৎ একটি ইন্ডিয়ান হস্তান্তরযোগ্য দলিল, বিনিময় বিল বা প্রমিজরি নোট যা বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যবহৃত হয়।

Wikipedia তে বলা হয়েছে- A Hundi is a financial instrument that developed in Medieval India for use in trade and credit transactions. অর্থাৎ হুন্ডি হচ্ছে এক ধরনের আর্থিক দলিল যা মোঘল সম্রাজ্যের সময় ভারতে বাণিজ্য ও ক্রেডিট লেনদেনের জন্য ব্যবহার হতো।

হুন্ডির প্রকারভেদ

হুন্ডি বেশ কয়েক ধরনের। যেমন- সাহিয়গ হুন্ডি, দর্শনী হুন্ডি, মুদ্দতি হুন্ডি, নাম-যোগ হুন্ডি, ফরমান-যোগ হুন্ডি, ধানি-যোগ হুন্ডি, জোখিম হুন্ডি, জবাবি হুন্ডি, খাকা হুন্ডি, খতি হুন্ডি।

সাহিয়গ হুন্ডি: গুজরাটি ও হিন্দি ভাষায় সাহিয়গের অর্থ হলো ‘সহযোগিতা করা’। সাহিয়গ হুন্ডির মাধ্যমে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অন্য এক ব্যবসায়ীকে তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে অর্থ দিতে বলা হয়। এটি হুন্ডি ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়ীক ভাষা। যেমন, তালহা ও জামাল দুই ব্যবসায়ী। তালহা যেকোনো মাধ্যমে জামালকে বলল যে, রফিককে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে দাও।

দর্শনী হুন্ডি: এটি হুন্ডির আরেকটি রূপ। এ হুন্ডি চাহিদা বিলের অনুরূপ যা দেখা মাত্র দিতে হবে। এটি ধারক দ্বারা পাওয়ার পরে সঠিক সময়ে পেমেন্টের জন্য উপস্থাপন করতে হবে।

মুদ্দতি হুন্ডি: এ হুন্ডিকে মেয়াদি হুন্ডি বলা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর হুন্ডি প্রদান করতে হয়। এটি একটি ‘টাইম বিলে’র অনুরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নাম-যোগ হুন্ডি: এ হুন্ডি নাম কেন্দ্রিক। হুন্ডির উপর উল্লেখ করা নামেই শুধু অর্থ পরিশোধ করা হবে। এ ধরনের হুন্ডি অন্য কোনো ব্যক্তির পক্ষে অনুমোদন করা যাবে না।

ফরমান-যোগ হুন্ডি: এ হুন্ডিতে নির্দেশিত ব্যক্তিকে অর্থ দেয়া যেতে পারে। এ ধরনের হুন্ডির অর্থ পেমেন্ট অর্ডার চেকের অনুরূপ। এতে কোনো অনুমোদন লাগে না।

ধানি-যোগ হুন্ডি: এ হুন্ডির অর্থ ধারক বা বহনকারীকে দেয়া হয়। এটি বেয়ারার দলিলের অনুরূপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

জোখিম হুন্ডি: হুন্ডি শর্তহীন। কিন্তু জোখিম হুন্ডিতে শর্ত ভেঙে যায়। এ হুন্ডি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট শর্তের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হুন্ডির অর্থ পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। মূলত এ ধরনের হুন্ডি বিনিময়যোগ্য নয়।

জবাবি হুন্ডি: এ হুন্ডির মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অর্থ স্থানান্তর করা হয়। সেটির জন্য অর্থদাতা ব্যক্তি দ্বারা প্রাপ্তি স্বীকার করতে হয়। ফলে এমন হুন্ডিকে জবাবি হুন্ডি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

খাকা হুন্ডি: এরইমধ্যে যে হুন্ডি পরিশোধ হয়েছে তাকে খাকা হুন্ডি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

খতি হুন্ডি: এ হুন্ডিতে ত্রুটি-বিচ্যুতি বা জালিয়াতির যোগসূত্র রয়েছে। হুন্ডিতে কোনো ধরনের ত্রুটি বা জালিয়াতি হলে তাকে খতি হুন্ডি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

হুন্ডির অপকারিতা বা ক্ষতি

এক সময় হুন্ডি পদ্ধতির ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় হুন্ডিকে রেমিট্যান্স ধ্বংসকারী পদ্ধতি হিসেবে ধরা হয়। এতে ব্যাংকিং নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। ফলে রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয় সরকার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এটি অপরাধ। হুন্ডির নানা ক্ষতির দিক রয়েছে। যেমন:-

* আয়কর কর ছাড় মেলে না।

* বৈধ উপার্জন অবৈধ হিসাবে রূপান্তরিত হয়।

* হুন্ডির লেনদেহ নানা দেশের নির্ধারিত সংস্থা দ্বারা যাচাই হয়। যেমন, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU)।

* হুন্ডিতে টাকা পাঠালে প্রবাসী রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

* অর্থ পাঠানা ও অর্থ প্রাপ্তি ঝুঁকিপূর্ণ হয়। অনেক সময় নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়।

* ব্যাংকিং সুবিধা বা বিনিয়োগ পাওয়া যায় না।

* হুন্ডির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পায়। এতে নিজের ও প্রবাসের দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হয়। ফলে দুই দেশের হিসাবে গড়মিল হলে সম্পর্কে ঝামেলা হতে পারে।

* অবৈধ টাকার মালিকরা প্রবাসীদের টাকা বিদেশে রেখে সম্পদ পাচার করার সুযোগ পেয়ে যায়।

* আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এলে অপরাধীদের শাস্তির মুখে পড়তে হবে।

হুন্ডির আয় কী হালাল?

হুন্ডির আয় হালাল না হারাম তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইসলামি স্কলার ড. মো. মনজুর ইলাহী।

তিনি বলেন, হুন্ডি ব্যবসা হচ্ছে, অবৈধভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ চালান দেয়া। রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী এটি অপরাধ। পুরো বিশ্বজুড়ে এ আইন রয়েছে। দেশের নাগরিকদের উচিত সেই আইন মেনে চলা। হুন্ডির মাধ্যমে বড় বড় চোরাচালানকারী অবৈধভাবে সুযোগ নিচ্ছে। তাই দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ও নানা কল্যাণ সাধনের জন্য হুন্ডি ব্যবসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞা একজন মুসলমানের মেনে চলা উচিত। যদিও হুন্ডি ব্যবসা সম্পর্কে হাদিসে কোনো বক্তব্য আসেনি বা ব্যবসাটি অবৈধ বলে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। তবুও এটি নিষিদ্ধ। কারণ  যা সমাজের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনে তা সবাই মিলে বর্জন করা উচিত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, যেহেতু হুন্ডি ব্যবসার মাধ্যমে টাকা লেনদেনে নিষেধ রয়েছে, তাই সবাই বৈধ উৎসের দিকে গিয়ে টাকা হস্তান্তর করতে হবে।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/স

Sharing is caring!