নিউজ ডেস্ক :

বন্যা থেকে রক্ষা, নদীভাঙন, নদীশাসন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে বহু আলোচিত ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। ‘ডেল্টা প্ল্যান’ নামে পরিচিত দেশের ইতিহাসে প্রথম শতবর্ষী এই মহাপরিকল্পনায় আপাতত ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য ৮০টি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এতে ব্যয় হবে প্রায় দুই হাজার ৯৭৮ বিলিয়ন টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। মহাপরিকল্পনার বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এছাড়া মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে চেয়ারপারসন করে গঠিত ‘ডেল্টা গভর্ন্যান্স কাউন্সিল’ কাজে গতি বাড়াবে।

শতবর্ষী ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-কে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ‘চাবিকাঠি’ হিসেবে দেখছে সরকার। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আলাদা তহবিল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। পরিকল্পনার আওতায় যেসব প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে, সেসব প্রকল্প ও কর্মসূচিতে অর্থের যেন কোনো ঘাটতি না হয়, সে জন্য তহবিলও গঠন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বাড়বে দেড় শতাংশ। নিশ্চিত হবে টেকসই উন্নয়ন।

জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী ও ডেল্টা গভর্ন্যান্স কাউন্সিলের ভাইস-চেয়ারম্যান এম এ মান্নান ভোরের কাগজকে বলেন, শতবছর মেয়াদি এ পরিকল্পনা একটি আমব্রেলা প্রকল্প। আমরা ধাপে ধাপে পরিকল্পনা নিয়েছি। এরমধ্যে কোনোটি দ্বিবার্ষিক, কোনোটি পঞ্চবার্ষিকী আবার কোনোটি ২০ বছর মেয়াদি। করোনাকালেও উন্নয়ন থেমে থাকেনি। কিছু কিছু উন্নয়ন প্রকল্প চলমান। মন্ত্রী বলেন, ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে উপক‚লীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওর এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকা, পার্বত্যাঞ্চল ও নগর এলাকা এই ছয়টি স্থানকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অঞ্চলভেদে আর্থসামাজিক বৈষম্য এবং এর ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের জন্য বাজেট বরাদ্দও রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়েছে। এতে কাজের গতি বাড়বে।

সরকারের ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ১০টি মন্ত্রণালয় ডেল্টা প্ল্যানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেগুলো হলো কৃষি মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়। এর সাচিবিক দায়িত্বে রয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ। এ ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম ভোরের কাগজকে বলেন, ডেল্টা পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ৬৫টি প্রকল্প ভৌত অবকাঠামোসংক্রান্ত। বাকি ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়নের। ঝুঁকি বিবেচনায় সারাদেশে ছয়টি হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, অনেকগুলো উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। করোনাকালে কিছুটা ধীরগতি এলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা হবে না। ২০৩০ সালের মধ্যেই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীভাঙনের ফলে প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি হচ্ছে। রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। মানবসৃষ্ট নানা কারণে প্রাকৃতিক পানিচক্র বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। কমে যাচ্ছে পানির গুণগত মান ও প্রাপ্যতা। বাড়ছে লবণাক্ততা ও মিঠা পানির স্বল্পতা। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার জন্য বন্যা, খরা, সাইক্লোনের ঝুঁকি বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে ডেল্টা প্ল্যান সঠিক বাস্তবায়নের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা।

জানতে চাইলে জলবায়ু ও পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনূন নিশাত ভোরের কাগজকে বলেন, ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের সঙ্গে করোনা সম্পৃক্ত নয়। পরিকল্পনা তো অনেক আগেই নেয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো আরো আগেই শুরু করা প্রয়োজন ছিল। জলবায়ু মোকাবিলায় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের অগ্রগতি লক্ষ্য করিনি। তিনি বলেন, পানির ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। এক প্রকল্পের সঙ্গে আরেক প্রকল্পের কোনো যোগাযোগ নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সমন্বয় প্রয়োজন। এখন বন্যা হচ্ছে। এখুনই ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া উচিত।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে উপক‚লীয় অঞ্চল রক্ষা করতে হলে বনায়নের মাধ্যমে ‘সি-ওয়াল’ তৈরির পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, এতে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। সবুজ বেষ্টনী তৈরি করতে হবে। এছাড়া খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের জন্য বাঁধ সংস্কারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় স্লুইস গেট তৈরি করতে হবে। সবই ডেল্টা প্ল্যানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ব্যাপারে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান ভোরের কাগজকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ডেল্টা প্ল্যান অত্যন্ত সময়োপযোগী। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে বাস্তবায়ন কাউন্সিল গঠিত হয়েছে তা জাতিকে আশান্বিত করেছে। তবে প্রকল্প কাজে সমন্বয়, বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া এবং ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/সকা

Sharing is caring!