সংলাপ প্রতিবেদক :

‘ঘাতকের রক্তচক্ষু মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে/ স্বজনের রক্তেভেজা এই বাংলায়/ বুকে কষ্টের পাথর চেপে/ চোখে অশ্রুর সমুদ্র নিয়ে/ ক্লান্তিহীন তুমি ছুটে যাও গ্রাম থেকে গ্রামে/ শহরের পোড়া বিধ্বস্ত বস্তিতে;/ মায়ের মমতা দিয়ে বুকে নাও দুখিনীরে।’ ‘তুমি ভূমিকন্যা’ শিরোনামের কবিতায় পিতৃহারা বাংলার জনগণের পাশে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার অবিরাম ছুটে চলাকে এভাবেই চিত্রিত করেছেন কবি মুহাম্মদ সামাদ। দিনটি ছিল ১৭ মে, ১৯৮১ সাল। মাতৃভূমি বাংলাদেশে পিতা-মাতাসহ পরিবারের সব সদস্য (ছোটবোন রেহানা ছাড়া) নিহত হওয়ার ছয় বছর পর প্রবাস থেকে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। এর আগে ওই বছরই তার অনুপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় তাকে।

আর পেছন ফিরে তাকাননি তিনি। গত চার দশক ধরে ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্পের’ মতোই আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে ছুটে চলেছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। এক যুগ ধরে রেখেছেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের হাল। পেছনে তাড়া করে ফেরা মৃত্যুকে তুচ্ছ করে কোভিডকালেও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অর্থনীতির চাকা। হেনরি কিসিঞ্জারের বটমলেস বাস্কেটকে বিশ্বে পরিচিত করেছেন উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসেবে। সেই অমিততেজ নন্দিত রাষ্ট্রনায়কের ৭৫তম জন্মদিন আজ, ২৮ সেপ্টেম্বর, শুভ জন্মদিন শেখ হাসিনার।

টুঙ্গিপাড়ার হাসু আপা:

মধুমতি নদী বিধৌত গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রাম। এই নিভৃত পল্লীতেই ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছার কোল আলোকিত করে জন্ম নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। শৈশব কৈশোর কেটেছে বাইগার নদীর তীরে টুঙ্গিপাড়ায় বাঙালির চিরায়ত গ্রামীণ পরিবেশে, দাদা-দাদির কোলে-পিঠে। পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন জেলে বন্দি, রাজরোষ আর জেল-জুলুম ছিল তার নিত্য সহচর।

শেখ হাসিনার শিক্ষাজীবন শুরু হয় টুঙ্গিপাড়ার এক পাঠশালায়। এরপর টিকাটুলির নারীশিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়, আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা, ঢাকার বকশী বাজারের ইন্টারমিডিয়েট গভর্নমেন্ট গার্লস কলেজ (বর্তমানে বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন ১৯৬৭ সালে। একই বছর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কিশোর বয়স থেকেই রাজনীতিতে পদচারণা তার। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রলীগের নেত্রী হিসেবে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ৬-দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। কলেজছাত্র সংসদের সহসভানেত্রী (ভিপি) নির্বাচিত হন বিপুল ভোটে। কারাবন্দি পিতার আগ্রহে পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় ১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর। বিয়ের পর বাঙালির ১১ দফা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। একাত্তরের ১৭ ডিসেম্বর পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে গৃহবন্দি থেকে মুক্ত হন তিনি। পঁচাত্তরের পনের আগস্ট কালরাতে ঘাতকের নির্মম বুলেটে সপরিবারে জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের সময় বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

আমি নেতা নই, সাধারণ মেয়ে:

শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার লেখা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ বই থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, প্রয়াত জিল্লুর রহমান, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক, প্রয়াত আব্দুস সামাদ আজাদ, আমির হোসেন আমু আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিতে শেখ হাসিনাকে রাজি করানোর জন্য দিল্লিতে যান। তবে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এ প্রস্তাবে ওয়াজেদ মিয়ার সম্মতি ছিল না। অবশ্য শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে দলের সভাপতি করা হয়।

এম এ ওয়াজেদ মিয়া তার বইতে আরো লিখেছেন, স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন সংবর্ধনা জানানোর জন্য ১০-১২ লাখ লোকের সমাগম হয়েছে বলে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা সূত্রে বলা হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মতে, ওই দিন ঢাকায় ১৫ লাখ লোকের সমাগম হয়েছিল। শেখ হাসিনা সেদিন জনতাকে উদ্দেশ্য বলেছিলেন, আমি নেতা নই, সাধারণ মেয়ে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার একজন কর্মী, আপনাদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য আপনাদের নিয়ে নিরলস সংগ্রাম করে যাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্যই নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তার কন্যা শেখ হাসিনা। এ ব্যাপারে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ভোরের কাগজকে বলেন, বঙ্গবন্ধু সারাজীবন সাধারণ জনগণের কল্যাণ চেয়েছেন। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কৌশল পাল্টে গেছে, অনেক জায়গায় ব্যত্যয় ঘটেছে তবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণের পথেই হাঁটছেন তার কন্যা শেখ হাসিনা।

কলঙ্কমোচনের পথে অগ্রযাত্রা:

বাংলার মানুষের অধিকার পুনরুদ্ধারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বারবার সামরিক স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছেন শেখ হাসিনা। সুদীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক পথচলায় স্বৈরশাসনের অবসান, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্য বিমোচন করে বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত করেছেন। জাতির পিতার খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ এবং রায় কার্যকর করে জাতির কলঙ্কমোচন করেছেন। জঙ্গিবাদ দমন করে যাচ্ছেন কঠোর হাতে। নিজ দলেও চালিয়েছেন শুদ্ধি অভিযান। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ ভোরের কাগজকে বলেন, শেখ হাসিনা জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকর করে জাতিকে পিতৃহত্যার কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছেন। নিজ দলে শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছেন। এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন। এটি সারাবিশ্বে প্রশংসিত।

অবিশ্বাস্য উন্নয়নের অদম্য রূপকার:

১৬ জুলাই ২০০৭। গ্রেপ্তার হন শেখ হাসিনা। ঠাঁই হয় জাতীয় সংসদ এলাকার সাবজেলে। দীর্ঘ ১১ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ জুন এই জেল থেকে মুক্তি পান তিনি। বর্তমানে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করছেন শেখ হাসিনা। রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করেছেন সব সংকট ও আঘাতের ক্ষত। তার নেতৃত্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শিক্ষা, চিকিৎসা, নারীর ক্ষমতায়ন, অবকাঠামো উন্নয়নসহ প্রায় সব খাতে বিশ্বের বুকে নতুন নজির স্থাপন করতে শুরু করে বাংলাদেশ। এমনকি চলমান করোনা মহামারি মোকাবিলায় সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি মেলে। সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এক যুগে এসেছে নানা সাফল্য। মাথাপিছু গড় আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ ডলার। ৫০ বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি। করোনার সার্বিক অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা বিবেচনায় বিশ্বে বসবাস উপযোগী নিরাপদ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২০তম। দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশ এ তালিকায় বাংলাদেশের উপরে নেই। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক ভোরের কাগজকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছেন তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মেগা প্রকল্প, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটর এক্সপ্রেস, মাতারবাড়ী প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। কৃষিতে সরব বিপ্লব। বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের প্রশংসা আজ বিশ্বজুড়ে।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/দু

Sharing is caring!