সংলাপ প্রতিবেদক :

সৃষ্টিকর্তার ওপর পূর্ণ বিশ্বস ও আস্থা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র- এই চারটি মূলনীতির ভিত্তিতে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি নামক রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ৪৩ বছর পর বহু ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বিএনপি আজো দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল। ২০০৬ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে দীর্ঘ ১৩ বছল ধরে দলটি নানা সংকটে ধুঁকছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে গড়া জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মূল চেতনা থেকে সরে আসাটাই বিএনপির সংকটের মূল কারণ। তারা বলছেন, জিয়াউর রহমান দলে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তা এখনকার বিএনপি ভুলতে বসেছে। একের পর এক নীতিগত ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দলটি রাজনীতির মাঠে উঠে দাঁড়ানোর শক্তিও হারিয়েছে। তারা বলেন, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরে বিএনপি তার মতো জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মনা একজন নেতাকেও তৈরি করতে পারেনি, যিনি খালেদা জিয়ার অবর্তমানে গোড়ালি শক্ত করে রাজনীতির মাঠে বিএনপিকে সক্রিয়ভাবে টিকিয়ে রাখতে পারে। যদিও দলটির বর্তমান নেতৃত্বে যারা আছেন তারা এ কথা মানতে নারাজ। টানা ১৩ বছর ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। সর্বশেষ নির্বাচনে চরমভাবে বিপর্যস্ত। বিপুল জনসমর্থন থাকার পরও সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে কৌশলে কোনোভাবেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছে না

বিএনপি। নেতাকর্মীরা হতাশায় ভুগছেন। নেতৃত্বের সংকট, সময়কে অনুধাবনের অক্ষমতা, একগুঁয়েমি, বিভিন্ন পর্যায়ে যোগ্য ও দক্ষ নেতা নির্বাচনে ব্যর্থতার কারণেই দীর্ঘ সময় ধরে দলটি ক্ষমতার বাইরে। বিএনপি সরকার, সংসদ, রাজপথ- কোথাও নেই। প্রশ্ন উঠেছে- রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির অবস্থান কোথায়? অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়ে বিশ্লেষকরা বলেন, নেতাকর্মীদের ক্ষমতায়ন করে অধিকতর গণতান্ত্রিক ভাব আনতে হবে দলটির ভেতরে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির পরিবর্তন, পরিমার্জন ও পরিশোধন করতে হবে। অভ্যন্তরীণ নীতি বলতে দলীয় কর্মসূচি প্রণয়ন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কে মাত্রা কী হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। এর পাশাপাশি বিএনপির নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো দাঁড় করা হবে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান তার শাসনামলের শেষদিকে সার্ক প্রতিষ্ঠায় ভ‚মিকা রেখে আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করলেও দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আমল থেকে বিএনপি ভারতবিদ্বেষ রাজনীতিতে সরব হয়। ভারতবিদ্বেষের নামে সৃষ্টি হয় হিন্দুবিদ্বেষও। কিন্তু ভোটের হিসাব কষে পলিসিগত কারণে ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে বর্তমানে সরে এসেছে দলটি। এ বিষয়ে বিএনপির নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের মতো ভারতও এ দেশে অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। একটি ভালো নির্বাচনের জন্য কী প্রয়োজন, সে সম্পর্কে বিএনপির চাওয়াগুলো তাদের জানানো হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বেশকিছু সমস্যা আছে। জিয়াউর রহমান যে রাজনীতি করেছিলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সমস্যাগুলো অনুচ্চারিতভাবে বলেছিলেন। এ ব্যাপারে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন। তার যে বক্তব্য সেখানে তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা যেভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছিলাম সেভাবে আমাদেরও দাবি আদায়ে লড়াই করে যেতে হবে। বাংলার পানি বণ্টনের জন্য তিনি মওলানা ভাসানীকেও অনুরোধ করেছিলেন, লংমার্চ করার জন্য। কিন্তু বিএনপিকে এসব ব্যাপারে স্বোচ্ছার হতে দেখা যায় না। তাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে হলে মানুষের যেসব দাবি, আশা-আকাক্সক্ষা আছে তা ধারণ করে যেতে হবে। পাশাপাশি পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিকেও বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে। ভারতবিরোধী অবস্থান তাদের জোরালোভাবে স্পষ্ট করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রাজনীতির কথা চিন্তা করে কারো মুখাপেক্ষি না হয়ে বিএনপিকে জনগণের শক্তির ওপর ভরসা করতে হবে। জিয়াউর রহমান যেভাবে জনগণের শক্তির ওপর ভরসা করে রাজনীতি করতেন তাদেরও কারো অনুকম্পার আশা, কোনো শক্তির আশা বাদ দিয়ে এগোতে হবে। ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, জিয়াউর রহমানের আদর্শের বিষয়টি তুলে ধরতে পারলেই বিএনপির সব সমস্যার সমাধান আসবে। এক্ষেত্রে ক্ষমতা এক কেন্দ্রিক না রেখে নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। কারণ পরিস্থিতিই সঠিক নেতৃত্ব তৈরি করে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি কঠিন দুঃসময় অতিক্রম করছে। তবুও জিয়াউর রহমানের নীতি এবং আদর্শ থেকে এক পাও নড়েনি। তার তৈরি করা গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করতে বিএনপি লড়াই করে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সমালোচনার কোনো সুযোগ নেই। এখনকার বিএনপি অন্য সময়ের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি সংগ্রাম করছে। তিনি বলেন, আমাদের শপথ হচ্ছে, গণতন্ত্রের নেত্রী খালেদা জিয়াকে স্থায়ীভাবে কারামুক্ত করা। বিএনপি ঐক্যবদ্ধ আছে এবং দলে কোনো নেতৃত্বের সংকট নেই।

ইসলাম ধর্ম তথা ধর্ম বিশ্বসী দল হিসেবে বরাবরই সাধারণ জনগণের সহমর্মিতা অর্জন করে যাচ্ছে বিএনপি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অনেক কিছুই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোশকতায় ফিরিয়ে আনা হয়। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে জামায়াতে ইসলামীর ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞাটা তুলে নেয়া হয়। পাকিস্তানে লুকিয়ে থাকা জামায়াত নেতারা একে একে ফিরেও আসে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরে। জামায়াতে ইসলামীর ‘পুনর্জন্ম’ না হলে বাংলাদেশে ধর্মের রাজনীতি এভাবে বিকশিত হতো না। পরবর্তীতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃতি দেয় দলটি। এরপরই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির লেবাসে দেশে ব্যাপকভাবে বিকাশ ঘটে জঙ্গিবাদের। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াতের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ে দেশি এবং আন্তর্জাতিক মহলের চাপে ধর্মভিত্তিক দলের তকমা থেকে বের হতে চাইছে বিএনপি।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন বলেন, কোনো দেশ বা দলের বিরোধিতা থেকে নয়, নানা সংকট মোকাবিলা করে বিএনপি ৪৩ বছরে একটি পরীক্ষিত জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় কোনো ধর্মভিত্তিক দলের ওপর ভরসা রেখে বিএনপি চলছে না। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ভোটের রাজনীতি। তবে ভবিষ্যতে বিএনপি তাদের সঙ্গে রাখবে কিনা- সেটা সময়ই বলে দেবে।

কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে কিছু বিব্রতকর অপ্রিয় সত্য কথা বলতেই হয়। জিয়াউর রহমান যে নীতি এবং আদর্শকে প্রচার করেছিলেন, সেটির চর্চা ও অনুশীলন কমে গেছে। তৃণমূলে জিয়াউর রহমানের চিন্তাকে প্রসারিত করা এই মুহূর্তে জরুরি। কারণ, ৪৩ বছরে সম্পূর্ণ জেনারেশন বদলে গেছে। এক্ষেত্রে লন্ডন থেকে তারেক রহমান যেহেতু আসতে পারছেন না, সেহেতু তার বিকল্প চিন্তা না করলে আগামীতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখা দুঃসাধ্য হবে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিএনপিতে এখন জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি হারিয়ে গেছে। এখন বিদেশ থেকে তারেক রহমান নেতাকর্মীদের ওপরে সব চাপিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান এই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তারেক রহমান নেতৃত্ব ছাড়তে না পারলে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।

প্রসঙ্গত, ১৯৭৮ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিভিন্ন রাজনৈতিক পথ-মতের অনুসারীদের এক প্লাটফর্মে এনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যার পর সেনাবাহিনীতে চলছিল অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের পালা। সেই পটভ‚মিতে ৭ নভেম্বর ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন জিয়াউর রহমান। প্রথমে তিনি ১৯ দফা অর্থনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে জাগদল নামে রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা করেন। সেই প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যায়ে বিএনপির জন্ম হয়।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/বি

Sharing is caring!