সংলাপ ডেস্ক :

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্র্যাডলি জার্ডিন মধ্য এশিয়ায় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলোতে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রসার ও একই অঞ্চলে সিনো-রাশিয়ান নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে কাজ করছেন।ওয়াশিংটনের উইলসন সেন্টারের অধীনে কিসিঞ্জার ইনস্টিটিউট অন চায়না অ্যান্ড ইউনাইটেড স্টেটসে দুই বছরের ফেলোশিপে আছেন এই গবেষক।যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত বেসরকারি রেডিও স্টেশন রেডিও ফ্রি এশিয়ার উইঘুর সার্ভিসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তালেবানের হাতে আফগান সরকারের পতন ও শিংকিয়াং ও আফগানিস্তানে বসবাসকারী উইঘুরদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন জার্ডিন। পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করা হয়েছে।

তালেবান ও চীন সরকার বেইজিংয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছে। দেশটি তালেবানের দখলে থাকার ভবিষ্যৎ প্রভাব কী হতে পারে?

উইঘুরদের জন্য আফগানিস্তানের পরিস্থিতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তালেবানের সঙ্গে চীনের যোগাযোগের শুরু ১৯৯০ দশকে। তখন থেকেই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের শুরু। তালেবানের সঙ্গে চীনের এক ধরনের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ সমঝোতা চলমান ছিল, যেটি এখন প্রকাশ্যে এসেছে। আফগানিস্তান সরকারে কোনো না কোনো ভূমিকা যে থাকবে তালেবানের, সেটা চীন সরকার ধারণা করতে পেরেছিল। যে কারণে সীমিতভাবে হলেও তালেবানকে সহায়তা করার সম্পর্ক বজায় রাখে চীন।

এটাই উইঘুরদের জন্য বিপজ্জনক। ঐতিহাসিকভাবে উইঘুরদের ওপর নজর রাখার জন্য তাদেরকে আফগানিস্তানে নিয়ে আসার চেষ্টা করে তালেবান। আবার এও দেখা গেছে, নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে তালেবান উইঘুরদের সরিয়ে দিচ্ছে। তবে তালেবান প্রতিনিধি ও চীনাদের মধ্যে আলোচনা বাড়ছে।

স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে আমি আফগান উইঘুরদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমি জানতে পেরেছে, আফগান নাগরিকত্ব থাকার পরও তাদের পরিচয়পত্র ও কাগজপত্রে লেখা আছে তারা ‘চীনা অভিবাসী’। তারা এখন খুবই চিন্তিত, কারণ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন তালেবানের অধীনে চলে যাওয়ায় তাদের পরিচয়পত্র ও রেকর্ড তালেবানের মাধ্যমে চীনের হাতে চলে যেতে পারে। তেমনটা হলে উইঘুরদের খুঁজে বের করে চীনে ফেরত পাঠানো হতে পারে। সরকার পতনের পর তালেবানের হাতে যখন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ও নিবন্ধনের কাগজপত্র আসছে সেটা উইঘুরদের বিপক্ষে ব্যবহার করা হতে পারে।

কাবুলসহ পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে যাওয়াটা কি চীনের জন্য ঝুঁকি, নাকি সুযোগ? আপনি কী মনে করছেন?

আমার মনে হয় না চীন এটাকে সুযোগ হিসেবে দেখে, কারণ তারা আফগানিস্তানকে এমন ঝুঁকি হিসেবে মনে করে, যেটাকে সামাল দিয়ে রাখতে হয়। চীনের চোখে এভাবে হুট করে আমেরিকানদের চলে যাওয়াটা আদর্শ ঘটনা ছিল না। কারণ এতে করে মনে হচ্ছে, তালেবান বড় একটা জয় পেয়ে গেছে। এটা শুধু তালেবানই নয়, ইসলামপন্থি দলগুলো বিশেষ করে চরমপন্থি পক্ষগুলোকে আরও শক্তিশালী করবে।

চীন যে বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত সেটি হচ্ছে, আফগানিস্তানকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে গড়ে তোলা থেকে এই ধরনের দল ও সংগঠনগুলোরকে বিরত রাখতে পারবে না তালেবান। এটি পরবর্তীতে চীনের জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সব মিলিয়ে আফগানিস্তান এমন জায়গাগুলোর একটি, যেখানে সার্বিকভাবে চীনা, আমেরিকান ও পশ্চিমাদের স্বার্থটা মিলে যায়।

চীনের সামনে এখন যে সমস্যাটা আছে সেটা হলো, অদূর ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ ও সরকার পরিচালনা করবে তালেবান, এই বিষয়টা মেনে নেয়া ও একে বাস্তুসম্মত ভাবে সামাল দেয়া।

চীন এর মধ্যেই সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করছে, যা তার নিজস্ব ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষা করবে। স্বার্থটি হচ্ছে হচ্ছে চীনের শত্রু জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে আফগানিস্তানের সীমানার মধ্যে কাজ করতে বাধা দেয়া। তালেবান এটা নিশ্চিত করতে পারবে কিনা- সেটা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তারা আগেও দেশের ভেতর এই ধরনের চরমপন্থার বেড়ে ওঠাকে ঠেকাতে পারেনি, এবারও চীনের কৌশল অদূর ভবিষ্যতে সফল নাও হতে পারে।

আমরা জানতে পেরেছি, বছরের শুরুতে বহুসংখ্যক চীনা গুপ্তচরকে গ্রেপ্তার করে আফগান সরকার, যাদের কাজ ছিল ইস্ট তুর্কেস্তান ইসলামিক মুভমেন্টের (ইটিআইএম) অস্তিত্ব বিশ্বের সামনে উন্মোচন করা। আপনার কি মনে হয়, তালেবানের কাবুল দখলের পর তেমন কিছু একটা আবার ঘটবে?

আমার কাছে সন্ত্রাসী নিয়োগকারী সংস্থার ছদ্মবেশ ধরে কাজ করা চীনা গ্রুপের উদাহরণটা ইন্টারেস্টিং লেগেছে।

অতীতে চীন তার সীমানার বাইরে বা তার নিকটবর্তী অঞ্চলে বিশেষ করে মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তানে যে ধরনের নিরাপত্তা চেয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী একটা নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায় এ থেকে।

এ ঘটনা থেকে ভবিষ্যতমুখী একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়, যেমনটি বাদাখশান প্রদেশে আছে। সেখানে চীন সাম্প্রতিক সময়ে তার সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলো গড়ে তুলেছে। উদাহরণ হিসেবে তাজিকিস্তানের পামির মালভূমিতে সামরিক স্থাপনার কথাও বলা যায়, যেখান থেকে আফগানিস্তান সীমান্তে নজর রাখা সম্ভব।

যে কারণে আমার মনে হয় আমরা এই ধরনের ঘটনাগুলো আরও বেশি দেখব। বৈদেশিক নীতি পর্যবেক্ষদের কথা শুনলে বোঝা যায়, চীন আফগানিস্তান নিয়ে খুবই সতর্ক। তাদের বক্তব্যে তারা পুরনো কাসুন্দি ঘাটেন আর মনে করিয়ে দেন, আফগানিস্তান সাম্রাজ্যবাদির জন্য সমাধিস্থলের মতো।

সুতরাং চীন আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে খুব বেশি মাত্রায় জড়াতে দ্বিধায় থাকবে। তারপরও আমার যেটা মনে হয় যে ছোটখাট অভিযান, পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি বাড়তে দেখব। তবে আকারে ছোট হলেও এর মূল লক্ষ্য থাকবে চীন ওই অঞ্চলে যেগুলোকে উইঘুরদের জঙ্গি তৎপরতা ভাবছে- সেগুলো দমন করা।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/রা

Sharing is caring!