নিজস্ব প্রতিবেদক :

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণের তিন বছরেই নিজেদের অর্থে ব্যয় নির্বাহ শুরু করেছে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসসিএল)। এরই মধ্যে মহাকাশে কোম্পানির দ্বিতীয় কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ পাঠানো প্রস্তুতি নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে বড় সফলতা ধরা হয় মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ পাঠানো। তিন বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ কেনাভেরালে কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে সফল উৎক্ষেপণ করা হয় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১।

উৎক্ষেপণের ছয় মাস পর স্যাটেলাইটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বুঝে পায় বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে মহাকাশে স্যাটেলাইট প্রেরণকারী ৫৭তম দেশ হওয়ার গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট খরচ হয়েছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।

দেশের প্রথম কৃত্রিম এ উপগ্রহ উৎক্ষেপণের চিন্তা শুরু হয় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরপরই। এর নকশা তৈরির পরামর্শক নিয়োগ করা হয় ২০১২ সালে। নকশা প্রস্তুত হওয়ার পর প্রায় ১ হাজার ৬৫২ কোটি টাকায় ফ্রান্সের থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেসের কাছ থেকে কেনা হয় দেশের প্রথম স্যাটেলাইটটি।

বঙ্গবন্ধু-১ মূলত একটি যোগাযোগ স্যাটেলাইট। এটি দিয়ে দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো তাদের অনুষ্ঠান প্রচার করছে। পাশাপাশি ডিজিটাল নানা সেবা পৌঁছে যাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও।

বিসিএসসিএলের চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নিজের খরচে তো আমরা অবশ্যই চলি। বাৎসরিক আয়ের মাত্র এক শতাংশ লাগে এ কোম্পানি চালাতে। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো নিয়মিত বিল শোধ করলে এ কোম্পানি চালানো কোনো ব্যাপারই না। নিজস্ব টাকাতেই চলতে পারব।’

বিসিএসসিএল কর্মকর্তারা জানান, বছরে এই স্যাটেলাইট থেকে গড়ে এক কোটি ২০ লাখ টাকা করে আয় হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এ মোট ট্রান্সপন্ডার সংখ্যা ৪০। শুরুতে সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, দেশের জন্য ২০টি রেখে বাকিগুলো বিদেশি গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করা হবে।

বিসিএসসিএল বলছে, উৎক্ষেপণের দুই বছরেও কোনো ট্রান্সপন্ডার বিদেশি কোনো গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা যায়নি।

বিসিএসসিএল চেয়ারম্যান শাহজাহান মাজমুদ বলেন, ‘যখন মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়, তখন পৃথিবীতে স্যাটেলাইটের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। স্যাটেলাইট ব্যান্ডইউথ বা ফ্রিকোয়েন্সির দামও ছিল অনেক বেশি।

‘কিন্তু দেখা গেল, এটা উঠতে উঠতে পৃথিবীর অনেক দেশ অনেক স্যাটেলাইট তুলে ফেলেছে। এতে স্যাটেলাইট ব্যান্ডউইডথের দাম অনেক কমে যায়। এ জন্য আমরা আগের পরিকল্পনা মতো বাইরে বিক্রি করতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে অফার আছে। ফিলিপিন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল আমাদের অফার দিয়েছে। কিন্তু দাম অনেক কম। আমরা বলেছি, এ দামে আমরা বিক্রি করব না। এ জন্য আমরা বাইরে বিক্রি করিনি।’

টেলিভিশন সম্প্রচারের বাহিরেও বর্তমানে দেশের ৪০টি প্রত্যন্ত দ্বীপে টেলিমেডিসিন ও টেলি এডুকেশন সেবা দিচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট।

বিসিএসসিএল চেয়ারম্যান বলেন, ‘যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকেন, যেমন দ্বীপ কিংবা রিমোট এলাকা বা পার্বত্য এলাকায়, যেখানে ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল যায় না, সেখানে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ব্যান্ডউইথ আমরা পৌঁছে দিতে পারি। আমরা এরই মধ্যে মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দুরে অবস্থান করা ৪০টি দ্বীপে প্রযুক্তিসেবা পৌঁছে দিচ্ছি।

‘ওই সমস্ত জায়গায় হয়তো ভালো চিকিৎসক পাওয়া যাবে না, সেখানে এখানকার চিকিৎসকদের দিয়ে টেলিমেডিসিন সেবা দেয়া হচ্ছে। আরেকটি হচ্ছে, টেলি এডুকেশন। সেখানে হয়তো ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা নেই, ভালো শিক্ষক নেই। কিন্তু এই পদ্ধতিতে আমরা এখানকার শিক্ষকদের দিয়ে সেখানে শিক্ষা পৌঁছে দিচ্ছি।’

আসছে বঙ্গবন্ধু-২

বঙ্গবন্ধু-১ এর সফলতার পর এবার দেশের দ্বিতীয় কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিসিএসসিএল। এটির নাম ঠিক করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগেই মহাকাশে পাঠানো হবে এ স্যাটেলাইট। সে হিসেবে ২০২৩ সালে দ্বিতীয় স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ করবে সরকার।

বঙ্গবন্ধু-১ একটি জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট, যা কাজে লাগছে যোগাযোগের জন্য। আবহাওয়া, সামরিক বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত সুবিধা এতে মিলছে না। সেই ঘাটতি পূরণেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বিসিএসসিএলের চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা মনে করি, যদি জুন মাসে অর্ডার দিতে পারি, তাহলে দেড় বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালের গোড়ার দিকে বা প্রথম কোয়ার্টারে আমরা স্যাটেলাইট পাঠাতে পারব।

‘দ্বিতীয় স্যাটেলাইটটির কার্যপরিধি বিস্তৃত থাকবে। এটি অনেকটা হাইব্রিড স্যাটেলাইট হতে পারে। স্যাটেলাইটটিকে আবহাওয়া, নজরদারি বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।’

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/দু

Sharing is caring!