মোহাম্মদ সোহেল, নোয়াখালী :
নোয়াখালী সদর উপজেলার দুর্গম এলাকা বৃহত্তর চরমটুয়া। এখানে স্বাস্থ্যসেবার মান ছিল যুগের তুলনায় অত্যান্ত দুর্বল। তাই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিতে অন্য রোগীদের মতো প্রসূতি মায়েরাও ছুটে যেতেন শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে। প্রসূতিদের জন্য শহরের হাসপাতাল মানেই ছিল সিজারিয়ান অপারেশন! এখন সেই আতঙ্ক কাটিয়ে প্রসূতিদের মধ্যে আশার আলো জাগাচ্ছে চরমটুয়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সেবা ২৪/৭।

পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সমন্বয়ে এখন এই দুর্গম এলাকায় বদলে গেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের সেবার মান। প্রসূতি সেবা দানে এই কেন্দ্রটি অনন্য এক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। গর্ভবতী ও প্রসূতিদের কাছে নিরাপদ সন্তান প্রসবের আপন ঠিকানা এটি। এখানে নিরাপদে সন্তান প্রসবের জন্য দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বিনা খরচে সন্তান প্রসব শেষে হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যান মায়েরা। এই প্রসব সেবা কেন্দ্রে জন্ম নেওয়া প্রতিটি নবজাতককে দেয়া হয় নতুন জামা-কাপড়।
নিভিড় পর্যবেক্ষণে প্রসূতি মায়েদের সেবা প্রদান করায় শুধু চরমটুয়া ইউনিয়নের প্রসূতিরাই নয়, পাশের পূর্ব চরমটুয়া ও আন্ডারচর ইউনিয়নের প্রসূতিরাও আসেন এখানে সেবা নিতে।

চরমটুয়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী গত ২১ ফেব্রুয়ারী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. কামাল উদ্দিন বাবলুর সার্বিক সহযোগিতায় জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক একেএম জহিরুল ইসলাম এখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সেবা ২৪/৭ চালু করা হয়। এখানে প্রাথমিক অবস্থায় একটি ডেলিভারী রুম এবং একটি পর্যবেক্ষণ রুম রাখা হয়েছে। নিরাপদ প্রসব সেবায় কাজ করছেন একজন পরিবার কল্যাণ পরির্দশিকা, দুইজন আয়া। দুইজন আয়ার মধ্যে একজনকে দেওয়া হয়েছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। তার বেতন-ভাতা ইউনিয়ন পরিষদই বহন করে। এছাড়া প্রসূতিদের বুঝানোর জন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন ৬জন মাঠ কর্মী। নিরাপদ প্রসব সেবা কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর মার্চ মাসে এখানে ৮জন প্রসূতির মধ্যে ৬জনের নিরাপদ নরমাল ডেলিভারীতে নবজাতক জন্ম নেয়। এপ্রিল মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত ১২জন প্রসূতির মধ্যে ৯জনের নিরাপদ নরমাল ডেলিভারীতে নবজাতক জন্ম নেয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহায়তায় এখানে প্রতিনিয়তই বাড়ছে প্রসূতির সংখ্যা।

হঠাৎ করে এই কেন্দ্রের বদলে যাওয়ার পেছনের গল্প জানতে গিয়ে দেখা গেছে, এখানে রয়েছে চরমটুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন বাবলুর বিশেষ অবদান। জেলা শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দুরের দুর্গম এই এলাকার অনেক প্রসূতি সঠিক সময়ে সেবা না পেয়ে প্রসব যন্ত্রণায় কষ্ট পেয়েছেন। প্রসূতি ও নবজাতক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। প্রসূতি মায়েদের এসব সমস্যা নিরসনে এগিয়ে আসের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন বাবলু। চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারী চরমটুয়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলেন প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সেবা ২৪/৭। প্রসব সেবা কেন্দ্রের প্রতি প্রসূতি ও তাদের অভিভাবকদের আগ্রহ বাড়াতে ইউনিয়ন ব্যাপি মাইকিং, উঠোন বৈঠক, মসজিদ-মন্দিরে লিফলেট বিতরণসহ একাধিক কর্মসূচি পাল করেছেন তিনি। আবার প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সেবা কেন্দ্রে জন্ম নেওয়া প্রত্যেক নবজাতকের জন্য রাখা হয়েছে নতুন জামা-কাপড় উপহার।

উপজেলার চরমটুয়া ইউনিয়নের ব্রক্ষ্মপুর গ্রামের মো. মিজানের স্ত্রী পলি বেগম (২২) জানান, তিনি গর্ভবতী হওয়ার পর প্রসব নিয়ে ভয়ে ছিলেন। বেসরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করলে তারা জানিয়েছেন, সিজার অপারেশন করাতে অনেক টাকা লাগবে। এতে তার কষ্ট কম হবে এবং বাচ্চাও ভালো থাকবে। পরে ভয় নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে গেছেন। পরের দিন তার স্বামী ইউনিয়ন পরিষদে গেলে জানতে পারেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে নিরাপদে নরমাল ডেলিভারীর ব্যবস্থা আছে এবং এটি ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে। পরে সেখানে গিয়ে বিনা আপরেশনে তার সন্তান প্রসব হয়। সন্তান প্রসবের পরই চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে নবজাতকের জন্য নতুন জামা-কাপড় উপহার দেওয়া হয়। এক কথায় তার সন্তান প্রসব ছিল স্বস্তির।

পার্শ্ববর্তী পূর্ব চরমটুয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ জগৎপুর গ্রামের জসিম উদ্দিনের স্ত্রী শিরিন আক্তার জানান, গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে তিনি ওই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। নিয়মিত সেখান থেকে বিনা পয়সায় পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় ওষুধও পেয়েছেন। পরে সেখানেই নরমালে তার সন্তান প্রসব হয়। অথচ আগে অনেক ভয় পেয়েছি। জেলা শহরে নিলেই সিজার করানো হয়। আবার প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়াও কষ্টের।

তবে একাধিক প্রসূতি ও তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন, এই প্রসব কেন্দ্রে এখনও প্রসূতির চাপ কম থাকায় তারা ভালো সেবা পাচ্ছেন। ক্রমান্বয়ে যেভাবে প্রসূতিদের চাপ বাড়ছে, সেই ক্ষেত্রে এখানে আরো লোকবল, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী বাড়াতে হবে।

পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা হাসিনা আক্তার বলেন, এখানে যারা আসেন, তাদের সকলকে সাধ্যমতো চিকিৎসা দেওয়া হয়। সন্তান হওয়ার পরও নিয়মিত স্বাস্থ্য সেবা ও পরামর্শ পান এখানকার রোগীরা। শুধু প্রসূতি মায়েরা নয়, অনান্য রোগীরা এখান থেকে পরামর্শ ও ওষুধ নেন। অধিক গুরতর রোগ ও রোগীর ক্ষেত্রে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন তারা। কিছু সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এই পরির্দশিকা বলেন, প্রতিনিয়তই প্রসূতির সংখ্যা বাড়ছে। সেই ক্ষেত্রে এখানে আরো লোকবল বাড়ানো উচিৎ। পর্যবেক্ষণ রুমে বেড সংখ্যা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণেরও সংকট রয়েছে। সবচে জরুরি হলো, প্রসূতি পরিবহনের জন্য একটি গাড়ি। কারণ দুর্গম এলাকা থেকে প্রসূতিদের এখানে নিয়ে আসতে অনেক সমস্যা হয়।

উপ-সহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. ফরিদ উদ্দিন ফুয়াদ বলেন, আমাদের জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তা মহোদয়ের নির্দেশে আমরা এখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব কেন্দ্র স্থাপনের জন্য উদ্যোগ নিলে চরম অর্থ সংকট দেখা দেয়। পরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন বাবলু আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করেন। তার সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এই প্রসব সেবা কেন্দ্রে গত দুই মাসে এই কেন্দ্রে ১৫টি নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। প্রসূতি আসলে তাকে প্রথমে ভালোভাবে দেখা হয়। যদি ঝুঁঁকিপূর্ণ মনে হয় তাহলে সরকারি বড় হাসপাতালে রেফার করা হয়।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন বাবলু বলেন, আমাদের এই এলাকাটি শহর থেকে অনেক দুরে এবং দুর্গম এলাকা। এখানকার মানুষ সঠিক সময়ে ভালো স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। ইতিপূর্বে সময় মতো চিকিৎসার অভাবে অনেক প্রসূতি মা এবং নবজাতক বিপদগ্রামী হয়েছেন। তাদের কথা চিন্তা করে আমরা এখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সেবা কেন্দ্র চালু করেছি। আমার ইউনিয়নসহ আশপাশের ইউনিয়নের যতেষ্ঠ সাড়াও পাচ্ছি। অভিভাবকদের উৎসাহ দিতে নবজাতক জন্মের পরের তাদের জন্য নতুন জামা-কাপড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, এখানে কিছু সংকট রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি। অচিরেই প্রসূতিদের পরিবহনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে একটি গাড়ির ব্যবস্থা করা হবে।

পরিবার পরিকল্পনা জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক একেএম জহিরুল ইসলাম বলেন, চরমটুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সেবা কেন্দ্রটি মাত্র শুরু করা হয়েছে। আমরা আশা করছি এটি ভৌগলিক কারণে প্রসূতিদের আদর্শ সেবা কেন্দ্র হয়ে উঠবে। জনবল এবং উপকরণ সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় এসব সমস্যাগুলো খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান করবো। এখানে প্রসূতিদের সেবায় কোন কমতি থাকবে না।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/স

Sharing is caring!