মোহাম্মদ সোহেল, নোয়াখালী :
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চর জুবিলী ইউনিয়নের দক্ষিণ কচ্ছপিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরকারি বেড়িবাঁধ এবং বন বিভাগের গাছ কেটে স্থানীয় একটি চক্রের বানিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা মাদ্রাসার প্রভাবে দক্ষিণ কচ্ছপিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমছে শিক্ষার্থী সংখ্যা। এ নিয়ে র্দুচিন্তায় পড়েছেন শিক্ষকরা।

মঙ্গলবার (২৩ নভেম্বর) সকালে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় এলাকাবাসী, বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, করোনা মহামারিতে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় একটি চক্র দক্ষিণ কচ্ছপিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক থেকে দেড়’শ ফুটের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করে এবং বন বিভাগের গাছ কেটে প্রাথমিক ও গনশিক্ষা মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২৪ জুলাই’১৯ তারিখের গৃহীত সিদ্ধান্তের বিপরীতে মদিনাতুল উলূম নূরানী তালিমুল কুরআন মাদ্রাসা নামে একটি নুরানী (কওমি) স্থাপন করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ওই মাদ্রাসাটি সুকৌশলে দক্ষিণ কচ্ছপিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তাদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে নেয়।

দক্ষিণ কচ্ছপিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো.আবুল হাসেম বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের পাশেই অবৈধভাবে মদিনাতুল উলূম নূরানী তালিমুল কুরআন মাদ্রাসা গড়ে তোলায় করোনাকালীন সময়ে অভিভাবকদের ভুল বুঝিয়ে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে ওই মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে নিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি দেখা দিয়েছে। আমার নানা চেষ্টা করেও তাদেরকে বিদ্যালয়মূখী করতে পারছিনা।

বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মো. আবুল বাসার, মো. সাইফুল ইসলাম, কংকর চন্দ্র দাস ও সীমান্তী বালা দাস বলেন, এ মাদ্রাসায় ৩শতাধিক ছাত্রছাত্রী থাকলেও বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রাক প্রাথমিকে কোন শিক্ষার্থী নেই। প্রথম শ্রেণীতে ৮ জনের মধ্যে নিয়মিত ০১ জন, দ্বিতীয় শ্রেণীতে ১৪ জনের মধ্যে নিয়মিত ০৪ জন, তৃতীয় শ্রেণীতে ২১ জনের মধ্যে নিয়মিত ০৩ জন, চতুর্থ শ্রেণীতে ৩৫ জনের মধ্যে নিয়মিত ১৯জন ও পঞ্চম শ্রেণীতে ৬০ জনের মধ্যে নিয়মিত ৩১জন শিক্ষার্থীসহ বিদ্যালয়ে মোট ৫৮ জন ছাত্রছাত্রী নিয়মিত উপস্থিত হন। অথচ এই বিদ্যালয় থেকে বিগত বছরে ৮জন ট্যালেন্টপুল বৃত্তিসহ মোট ১৪জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে।

স্থানীয় মফিজুল হক, আলী আহম্মদ ও নুর নবী বাহার বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ের পাশে এবং সরকারি সম্পত্তি দখল করে মাদ্রাসা করায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমছে। এমন অবস্থা চলমান থাকলে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। ছাত্রছাত্রী মুখর বিদ্যালয় ফিরে পেতে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

মদিনাতুল উলূম নূরানী তালিমুল কুরআন মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক (মুহতামিত) মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই জায়গাটি আমরা দখল সুত্রে ক্রয় করেছি। সেখানে অস্থায়ীভাবে মাদ্রাসাটি গড়ে তোলা হয়েছে। তবে আমরা ওই জায়গা থেকে বন বিভাগের কোন গাছ কাটি নাই।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ও দক্ষিণ কচ্ছপিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবদুল কাদের সেলিম বলেন, ওই মাদ্রাসাটি গড়ে তোলার শুরুতেই আমরা বাঁধা দিয়েছি। মাদ্রাসার মালিকানায় থাকা ব্যক্তিরা বলেছে এটা তারা অস্থায়ী ভিত্তিতে করছেন। তারা মাদ্রসার জন্য জায়গা ক্রয় করেছেন, শুকনো মৌসুমে তাদের নিজস্ব জায়গায় মাদ্রাসাটি সরিয়ে নিয়ে যাবেন। যেহেতু এখনো তারা মাদ্রাসা সরিয়ে নেননি, তাই খুব শ্রীঘই আমরা প্রশাসনের নিকট লিখিত অভিযোগ দিবো।

সুবর্ণচর উপজেলা সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আজিজুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না। বিষয়টি বিস্তারিত অবগত হয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা পরিদর্শন করে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মুন্সী আমির ফয়সাল জানান, তিনি এ বিষয়ে কোন অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে।

সুবর্ণচর উপজেলা বন কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন জানান, এ বিষয়টি ২বছর আগের। তবে বন বিভাগের গাছ কাটা হয়েছে কিনা তা পুনরায় খতিয়ে দেখা হবে।

সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৈতি সর্ববিদ্যা জানান, মাদ্রাসার কারণে যদি সরকারি বিদ্যালয় হুমকির মুখে পড়ে তাহলে এবিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগ জানালে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

  • সংবাদ সংলাপ/এমএস/রা

Sharing is caring!