সংলাপ ডেস্ক :

পবিত্র রমজান মাসের রোজা প্রাপ্ত বয়স্ক প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফজর। আল্লাহ মহান পবিত্র কোরআনের সুরা বাকরার ১৮৩ নং আয়াতে এ মর্মে ইরশাদ করেছেন এবং সেখানে তিনি বলে দিয়েছেন যে, কেন রোজা ফরজ করা হয়েছে। এছাড়া হাদিসে রাসূলের (সা.) বিভিন্ন বর্ণনায় রমজান ও রোজা বিষয়ক আলোচনা বর্ণিত হয়েছে।

নিম্নে বিভিন্ন হাদিসের আলোকের রমজানের তাৎপর্য তুলে ধরা হলো-

রোজা পালনে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল গুনাহ মাফ করা হয়: হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবসহ রমজান মাসের সিয়াম পালন করবে, তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুণাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারি: ৩৮, মুসলিম:৭৬০)

রোজাদারদের জন্য জান্নাতের রাইয়ান দরজা
হজরত সাহল বিন সাদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, জান্নাতের একটি দরজা আছে, একে রাইয়ান বলা হয়, এই দরজা দিয়ে কিয়ামতের দিন একমাত্র রোজাদার ব্যক্তিই জান্নাত প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ এই পথে প্রবেশ করবে না। সেদিন এই বলে আহবান করা হবে রোজাদারগণ কোথায়? তারা যেন এই পথে প্রবেশ করে। এভাবে সকল রোজাদার ভেতরে প্রবেশ করার পর দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। অত:পর এ পথে আর কেউ প্রবেশ করেবে না। (বুখারি:১৮৯৬, মুসলিম: ১১৫২)

রোজাদারকে গালি দিলে উত্তরে যা বলবে
হজরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ কোনোদিন সিয়াম পালন করলে তার মুখ থেকে যেন অশ্লীল কথা বের না হয়। কেউ যদি তাকে গালমন্দ করে অথবা ঝগড়ায় প্ররোচিত করতে চায় সে যেন বলে, আমি রোজাদার। (বুখারি: ১৮৯৪, মুসলিম: ১১৫১)

রোজা একমাত্র আল্লাহর জন্য, তিনিই প্রতিদান দেবেন
হজরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, রোজা ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দেব। রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন রোজা পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার। যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তার শপথ! অবশ্যই রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিসকের গন্ধের চেয়েও সুগন্ধি। রোজাদারের জন্য রয়েছে দু’টি খুশি, যা তাকে খুশি করে। যখন যে ইফতার করে, সে খুশি হয় এবং যখন সে তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন রোজার বিনিময়ে আনন্দিত হবে। (বুখারি: ১৯০৪, মুসলিম: ১১৫১)

এ মাসের একটি রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমাদের নিকট রমজান মাস উপস্থিত। এটা এক অত্যন্ত বারাকতময় মাস। আল্লাহ তা’য়ালা এ মাসে তোমাদের প্রতি সাওম ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দরজাসমূহ উম্মুক্ত হয়ে যায়, এ মাসে জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং এ মাসে বড় বড় শাইতানগুলোকে আটক রাখা হয়। আল্লাহর জন্যে এ মাসে একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও অনেক উত্তম। যে লোক এ রাত্রির মহা কল্যাণলাভ হতে বঞ্চিত থাকল, সে সত্যিই বঞ্চিত ব্যক্তি। (সুনানুন নাসায়ী: ২১০৬)

এ মাসের রোজা পালন জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম: নাবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনলো, সালাত কায়েম করলো, যাকাত আদায় করলো, রমযান মাসে রোজা পালন করলো তার জন্য আল্লাহর ওপর সে বান্দার অধিকার হলো তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া। (বুখারি)

এ মাসে শয়তানকে আবদ্ধ করা হয়
রমজান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। হাদিসে এসেছে, যখন রমজান আসে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় আর জাহ্ন্নাামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়। (মুসলিম)

এ মাস ক্ষমা লাভের মাস
এ মাস পাওয়ার পরও যারা তাদের আমলনামাকে পাপ-পঙ্কিলতা মুক্ত করতে পারলো না রাসূল (সা.) তাদেরকে ধিক্কার দিয়ে বলেছেন, ওই ব্যক্তির নাক ধূলায় ধূসরিত হোক যার কাছে রমযান মাস এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না। (বুখারি)

ওমরাহ পালনে হজ আদায়ের সওয়াব
এ মাসে একটি উমরা করলে একটি হজ আদায়ের সওয়াব হয় এবং তা রাসূলুল্লাহ  (সা.)  এর সঙ্গে হজ আদায়ের মর্যাদা রাখে। হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমযান মাসে উমরা করা আমার সঙ্গে হজ আদায় করার সমতুল্য। (বুখারি: ১৭৯৫ মুসলিম: ১১৫১)

রোজা ভাঙার পরিণাম
সহিহ বুখারিতে উল্লেখ আছে, ‘যে ব্যক্তি অসুস্থতা ও সফর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের একটি রোযাও ভঙ্গ করে, সে আজীবন রোযা রাখলেও ঐ রোজার হক আদায় হবে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৯৮৯৩, সহিহ বুখারী ৪/১৬০) হযরত আলী (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রমযান মাসের একটি রোযা ভঙ্গ করবে, সে আজীবন সেই রোজার (ক্ষতিপূরণ) আদায় করতে পারবে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৯৮৭৮।)

রমজান মাসের চেয়ে উত্তম কোনো মাস নেই
হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলার কসম! মুসলমানদের জন্য রমযানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমযান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা মুমিনগণ এ মাসে (গোটা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনীমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৮৩৬৮)

জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যখন রমজান মাসের আগমন ঘটে, তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। মুহাদ্দিসীনে কেরাম বলেন, মুমিন বান্দাগণ যাতে রমযান মাসের অতি মূল্যবান ও বরকতপূর্ণ সময় নেক কাজে ব্যয় করতে পারে এবং মুনাফিকদের মত খায়ের ও বরকত থেকে বঞ্চিত না থাকে, তাই আল্লাহ তাআলা এ মাসের শুরু থেকেই সৃষ্টিজগতে এমন আবহ সৃষ্টি করেন, যা পুরো পরিবেশকেই রহমত-বরকত দ্বারা আচ্ছাদিত করে দেয় এবং মুমিনদের ইবাদত-বন্দেগি ও নেক আমলের উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগাবে।

তাদের পূণ্য ও প্রতিদানের সুসংবাদ দিতে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং পাপাচার ও খারাপ কাজ হতে বিরত রাখতে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। সব ধরনের ফিতনা-ফাসাদ ও অনিষ্ট হতে রক্ষা করতে কুমন্ত্রণাদাতা দুষ্টু জ্বিন ও শয়তানদেরকে শিকল লাগিয়ে আবদ্ধ করা হয়। তারপর কল্যাণের পথে অগ্রগামী হওয়ার ও অন্যায় থেকে নিবৃত্ত থাকার আহবান জানানো হয়। যেমন আবু হুরায়রা ( রা.)  থেকেই বর্ণিত এক হাদীসে আছে, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, যখন রমজান মাসের প্রথম রাতের আগমন ঘটে, তখন দুষ্টু জ্বিন ও শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।

জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়, তার একটি দরজাও খোলা হয় না এবং জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, তার একটি দরজাও বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে-হে কল্যাণের প্রত্যাশী! অগ্রসর হও, হে অকল্যাণের প্রার্থী! থেমে যাও। আর আল্লাহ তায়ালা এ মাসের প্রতি রাতে অসংখ্য জাহান্নামীকে মুক্তি দান করেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস ১৮৭৯৪)

  • সংবাদ সংলাপ/এসইউ/দু

Sharing is caring!