নৌ পুলিশের তদন্ত : ২১ মাসে উদ্ধার করা হয় ৬১৮টি মরদেহ। এর মধ্যে খুনের শিকার ৯০ জন। ১০টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও ৬ মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
নৌ পুলিশ বলছে, পচন ধরায় খুনের শিকার এসব মরদেহের মধ্যে ২২টির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে না পারায় ১০টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে নৌ পুলিশ। এ ছাড়া ছয়টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি ৭৪টির তদন্ত চলছে।
নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক শফিকুল ইসলাম বলেন, একেবারে পচে যাওয়ায় মরদেহ শনাক্ত করা যায় না। দীর্ঘদিন পানি ও বালুতে চাপা পড়ে মৃতদেহের শুধু হাড় পাওয়া যায়। মরদেহের পরিচয় পাওয়া গেলে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়। অপরাধীদের ধরা যায়। মরদেহে পচন না ধরলে নদীতে ভেসে ওঠে না। আবার পচে গেলে অনেক আলামত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কী কারণে মারা গেছে, সেটি শনাক্ত করা যায় না।
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত ২১ মাসে ৯০টি হত্যা মামলার মধ্যে ২২টি হয়েছিল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর। অর্থাৎ এই ২২ জন খুন হলেও প্রথমে অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে আলাদা দিনে দুটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহে পচন ধরায় তাঁদের হত্যা করা হয়েছে কি না, বোঝা যাচ্ছিল না। তাই অপমৃত্যু মামলা হয়। ১৩ মাস পর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে চিকিৎসক উল্লেখ করেন, তাঁদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। পরে দুটি হত্যা মামলা হয়।
কেরানীগঞ্জের বরিশুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) শাহজাহান আলী এই দুই হত্যা মামলার তদন্ত করেন। কূলকিনারা করতে না পেরে গত ১৮ অক্টোবর তিনি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন।
এসআই শাহজাহান বলেন, দুটি মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হতে বিভিন্ন থানায় ছবি পাঠানোসহ নানাভাবে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁদের পরিচয় না পাওয়ায় হত্যাকারীদের ধরা যায়নি।
ঢাকা অঞ্চলের নৌ পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্র জানায়, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ অঞ্চলে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১০টি হত্যা মামলা হয়েছে। একটিরও রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়নি। সব মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, দেখা যাচ্ছে, মরদেহ ফেলা হয় এক নদীতে, পাওয়া যায় অন্য নদীতে। তত দিনে মরদেহে পচন ধরে। পরিচয় না মিললে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২০ সালের ৯ নভেম্বর ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কের গৌরীপুরের গঙ্গাশ্রম এলাকায় জোড়া সেতুর নিচে স্যুটকেসবন্দী অর্ধগলিত এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিচয় শনাক্ত করতে মরদেহের ছবিসহ পোস্টার সাঁটানো ও কয়েক দফায় আলামত পরীক্ষা করা হয়।
সবশেষ আলামত পরীক্ষার সময় স্যুটকেসে একটি প্রেসক্রিপশন পাওয়া যায়। তারই সূত্র ধরে হত্যায় জড়িত দম্পতি ময়মনসিংহের আবুল খায়ের মো. জাকির হোসেন ও তাঁর স্ত্রী রিফাত জেসমিনকে চিহ্নিত করা হয়। খুনের শিকার তরুণী সাবিনা তাঁদের গৃহকর্মী ছিলেন। লাশ গুম করতেই তাঁরা সেতুর নিচে মরদেহ ফেলে দেন।
ভোলা সদরের ইলিশা ফেরিঘাটসংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে গত ১৯ অক্টোবর বস্তাবন্দী অর্ধগলিত অজ্ঞাত এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। দেখে চেনার উপায় নেই। তবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, এটা নিশ্চিত হয়ে পুলিশ মামলা করে।
ইলিশা নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আকতার হোসেন বলেন, মনে হচ্ছে, অন্য এলাকায় অন্তত ছয় দিন আগে এই তরুণকে খুন করে মরদেহ বস্তায় ভরে নদীতে ফেলা হয়েছে। মরদেহের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় তদন্ত শুরু করা যাচ্ছে না।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও দ্য মেডিকোলিগ্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক সোহেল মাহমুদ বলেন, মরদেহে পচন না ধরলে নদীতে ভেসে ওঠে না। আবার পচে গেলে অনেক আলামত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কী কারণে মারা গেছে, সেটি শনাক্ত করা যায় না।